আজ মঙ্গলবার সূর্য পশ্চিমাকাশে মিলিয়ে যাওয়ার পরই শুরু হবে বহু মুসলমানের কাছে কাঙ্ক্ষিত ও তাৎপর্যময় এক রাত—পবিত্র শবে বরাত। অনেকের বিশ্বাসে এটি এমন এক সৌভাগ্যময় রজনি, যেখানে আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে পাপমুক্ত হওয়ার অপার সুযোগ মেলে। আবার কারও দৃষ্টিতে, এই রাত ঘিরে প্রচলিত বহু রীতি ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শবে বরাত পালন নিয়ে আলেম-ওলামাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ বিদ্যমান, যা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
শবে বরাতের পক্ষে যারা অবস্থান নেন, তারা সাধারণত ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী বর্ণিত একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে হজরত আলি ইবনে আবি তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—মধ্য শাবানের রাতে ইবাদত ও দিনে রোজা রাখার কথা, এবং এই রাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বান্দাদের ডাকে সাড়া দেন, ক্ষমা ও রিজিক দান করেন। তবে বহু মুহাদ্দিস এই হাদিসকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের দোয়া, ক্ষমা ও প্রার্থনায় সাড়া দেন। এই হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো রাতের কথা বলা হয়নি। এখান থেকেই মূলত প্রশ্ন ওঠে—শবে বরাত কি বিশেষভাবে আলাদা কোনো রাত, নাকি এটি প্রতিটি রাতেরই সাধারণ একটি ফজিলতের অংশ?
উপমহাদেশের বহু আলেম মনে করেন, শাবান মাসের মধ্যরাত্রি আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ সময়। ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ নামে পরিচিত এই রাতে মুসলমানরা নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার, দরুদ পাঠ, ইস্তেগফার ও দোয়ায় মশগুল থাকেন। অনেকের কাছে এই রাত পরিচিত ‘লাইলাতুল বারাআত’ নামে—যেখানে ‘বরাআত’ অর্থ নাজাত বা মুক্তি।
যদিও কুরআনে সরাসরি শবে বরাতের উল্লেখ নেই, একটি ‘হাসান’ হাদিসে মধ্য শাবানের রাতের কথা পাওয়া যায়। তবে অনেক বিজ্ঞ আলেমের মতে, এই রাতে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ইবাদত বাধ্যতামূলক নয়। বরং এর পরই আসতে চলা রমজানের প্রস্তুতির মানসিকতা তৈরিই এ সময়ের মূল শিক্ষা। এ কারণেই কেউ কেউ শবে বরাতকে রমজানের ‘মুয়াজ্জিন’ বলে অভিহিত করেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ইসলামী বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, ইরান ও ভারতীয় উপমহাদেশে শাবান মাসের এই রজনিকে ‘শব-ই-বরাত’ বলা হয়। তুরস্ক, ইরান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। তবে সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অনেক অঞ্চলে শবে বরাত আলাদা কোনো ধর্মীয় রাত হিসেবে পালিত হয় না।
ইরানে অবশ্য এই রাতে ব্যাপক আলোকসজ্জা ও বিশেষ মাহফিলের আয়োজন দেখা যায়, যা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সেখানে প্রোথিত।
শবে বরাত সমর্থনকারী আলেমদের মতে, এই রাতে একান্তভাবে ইবাদত করাই উত্তম। দীর্ঘ কিয়াম, সেজদা, দুই রাকআত করে নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, বেশি বেশি দরুদ ও ইস্তেগফার করা উচিত। নিজের পাশাপাশি বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করার ওপর তারা গুরুত্ব দেন। পুরুষদের জন্য কবর জিয়ারত এবং মৃতদের জন্য দোয়া করাকেও তারা সওয়াবের কাজ হিসেবে দেখেন।
তবে বিরোধী মতের আলেমরা ইতিহাসের দিকে আঙুল তোলেন। তাদের মতে, রসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর প্রায় চার শতাব্দী পর্যন্ত শবে বরাত নামে কোনো আলাদা আমলের অস্তিত্ব ছিল না। সাহাবি ও তাবেয়িদের যুগেও এই রাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো আয়োজনের নজির পাওয়া যায় না।
ইবনে কাসির, ইবনুল কাইয়ুমসহ বহু ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, হিজরি ৪৪৮ সালে ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরে প্রথমবার শাবানের মধ্যরাতে সমবেতভাবে বিশেষ নামাজের প্রচলন হয়। কালক্রমে তা মসজিদুল আকসায় ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই একে সুন্নত মনে করতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে এই রীতি ইরান হয়ে উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে। এজন্য হকপন্থি আলেমরা শবে বরাতের বিশেষ নামাজ, হালুয়া-রুটি ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করে আসছেন।
সব বিতর্কের মধ্যেই আজ মঙ্গলবার যথাযোগ্য ধর্মীয় পরিবেশে দেশে শবে বরাত পালিত হবে। রাজধানীসহ সারা দেশের মসজিদে ওয়াজ মাহফিল, জিকির ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের উদ্যোগ নিয়েছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে আগামীকাল সরকারি ছুটি থাকবে, সংবাদপত্রের অফিস আজ বন্ধ থাকবে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হবে।
পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস দেশ ও জাতির কল্যাণে দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার দেওয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, শবে বরাত রহমত, মাগফেরাত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। হাদিসে বর্ণিত আছে, এই রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের বিশেষভাবে ক্ষমা করেন। তাই এই রজনিকে সৌভাগ্যের রাত হিসেবে গ্রহণ করে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান তিনি।

