শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রিমিয়ার ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন নিয়ে করা এক ফরেনসিক নিরীক্ষায় বড় ধরনের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন কৌশলে মোট ৩ হাজার ৮৮ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনারস এই নিরীক্ষা পরিচালনা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর ২০২৫ সালের আগস্টে গঠিত তদন্ত কমিটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের জেনারেল সার্ভিসেস, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ এবং বনানী শাখার মাধ্যমে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এতে সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার দুই ছেলে সাবেক পরিচালক মঈন ইকবাল ও ইমরান ইকবালসহ কয়েকজন সাবেক পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অফিস ভাড়া খাতে সবচেয়ে বড় অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে। ইকবাল পরিবারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চমূল্যে চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৪০৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। যেখানে বাজারদর ছিল প্রতি বর্গফুট ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, সেখানে ৩৫০ থেকে ৫০৬ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে মোট আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭১৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
এছাড়া সিএসআর, বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও ব্যবসা উন্নয়ন খাতে অনিয়মের মাধ্যমে আরও ৬০৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। ১২৮ কোটি টাকার সিএসআর ব্যয়ের বড় অংশ বাস্তবে বিতরণ না হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাঁচটি ভেন্ডর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার লেনদেনের অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে।
‘সান্ড্রি ডেবটরস’ নামে একটি হিসাব খাতকে অর্থ সরানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ খাত থেকে ৬৬৭ কোটি টাকার বেশি বিভিন্ন ভেন্ডর ও প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২২টি ভেন্ডর ও একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় ৬৫৫ কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
প্রিন্টিং ও স্টেশনারি খাতেও বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। ১২৯ কোটি টাকার ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃত সরবরাহ ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এতে প্রায় ৮২ কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর খুলনা টাইগার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি সংশ্লিষ্ট ব্যয়েও অনিয়মের তথ্য মিলেছে। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃত খরচ ছিল মাত্র ৬ কোটি টাকা।
এছাড়া অফিস ইন্টেরিয়র, নির্মাণ, সংস্কার, ভবন মেরামত এবং টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের খরচের নামেও অতিরিক্ত বা ভুয়া বিল দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আত্মসাৎ হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে একাধিক মামলা করেছে। ১১ মার্চ প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের নামে ৩৫ কোটি টাকার একটি মামলা করা হয়। এছাড়া ১৫ মার্চ অফিস ভাড়া ও ভেন্ডর সংক্রান্ত অনিয়মে ৩ হাজার ৫৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা উদ্ধারে আরও দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে এইচবিএম ইকবাল টানা ২৬ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।

