দেশের আবাসন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও পুঁজিবাজারে তার প্রভাব খুবই সীমিত। দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার অভাব এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণে রিয়েল এস্টেট খাতের অধিকাংশ কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারছে না। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রায় এক হাজার সদস্যের মধ্যে মাত্র একটি কোম্পানি, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড (ইএইচএল), পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, গত ৫২ সপ্তাহে ইএইচএলের শেয়ারদর সর্বনিম্ন ৬৩ টাকা ৭০ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ৯৩ টাকা ৮০ পয়সা। কোম্পানির শেয়ারের ফেসভ্যালু ছিল মাত্র ১০ টাকা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে শেয়ারের দর দাঁড়িয়েছে ৭৩ টাকা ৫০ পয়সা।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিয়েল এস্টেট খাত বড় হলেও কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তিতে আগ্রহী নয়। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন—আর্থিক পরিকল্পনার দুর্বলতা, স্বচ্ছ হিসাব-নিকাশের অভাব, করপোরেট গভর্ন্যান্সের বাস্তবায়নে অনীহা এবং দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা অর্জনের কৌশল না থাকা। তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিকে সব তথ্য প্রকাশ করতে হয়, যা ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক অনেক কোম্পানি করতে চায় না।
ইএইচএল উদাহরণ হিসেবে দেখাচ্ছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারে। ডিএসই তথ্য অনুযায়ী, ইএইচএল গত ১০ বছর ধরে নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান করে আসছে। চলতি বছরও কোম্পানিটি ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এটি তৃতীয়বারের মতো ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির স্থিতিশীলতা ও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ।
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূইয়া শেয়ার বিজকে বলেন, “পুঁজিবাজারে আসতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো মানতে হয়। জমি কেনাবেচা, নির্মাণ ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম থাকলে প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। বাজারের অস্থিরতা ও শেয়ারদর কমার ভয়ে অনেকে সাহস পান না।”
ইএইচএলের কোম্পানি সেক্রেটারি সেলিম আহমেদ জানান, “সাধারণত আবাসন কোম্পানির মালিকানায় থাকে একক ব্যক্তি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বোর্ড ও অ্যাকাউন্টসকে অনেক নিয়মের মধ্যে থাকতে হয় এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালক দিতে হয়। এ কারণে অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসে না।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আবাসন খাত পুঁজিবাজারে এলে বাজারের গভীরতা বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি বাড়ায়। পুঁজিবাজার এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের মনে হয়, ইএইচএলের ধারাবাহিক লভ্যাংশ তাদের আকৃষ্ট করছে। নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানের ধারাবাহিকতা স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। এটি অন্য আবাসন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করতে পারে।
রিহ্যাব জানিয়েছে, সারাদেশে প্রায় ৩ হাজারের বেশি আবাসন কোম্পানি আছে। এর মধ্যে সদস্য সংখ্যা ৮৯৪। সম্প্রতি ভূমিকম্প পর জরুরি মিটিংয়ে জানা গেছে, কোনো সদস্য কোম্পানির স্থাপনায় ক্ষতি হয়নি। রিহ্যাবের নির্মিত ভবনগুলোতে ভূমিকম্প সহায়ক রড ব্যবহার করা হয় এবং অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা নিয়মিত তদারকি করা হয়।
গত বছরের আবাসন মেলায় ৪০৩ কোটি ১২ লাখ ৭৪ হাজার টাকার ফ্ল্যাট, প্লট ও বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রি ও বুকিং হয়েছে। এর মধ্যে ফ্ল্যাট বিক্রি ও বুকিং হয়েছে ২৩০ কোটি টাকায়। প্লট-৯৬ কোটি ও বাণিজ্যিক স্পেস ৭৭ কোটি ১২ লাখ ৭৪ হাজার টাকায়। ব্যাংক কমিটমেন্ট এসেছে প্রায় এক হাজার নব্বই কোটি টাকা। মেলায় উপস্থিত ছিলেন ১৭ হাজার ৭২৯ জন ক্রেতা ও দর্শনার্থী।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা বাড়ানো হলে এবং কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির জন্য প্রণোদনা দিলে আবাসন খাতে আরও প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে আসবে। এতে বাজার ও পুরো অর্থনীতি দুইই উপকৃত হবে।

