বিদায়ী ২০২৫ সালে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা মুনাফার চেয়ে পুঁজি হারানোর অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি প্রত্যাশা ছিল অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান এবং বাজারের পুনরুজ্জীবন কিন্তু বছর শেষ পর্যন্ত এই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
শেয়ারবাজারের লেনদেন বছরের শুরুতেই নিম্নমুখী হয়। ১ জানুয়ারি লেনদেন মাত্র ৩৩০ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। বছর শেষ হতে আর মাত্র তিন কর্মদিবস বাকি, এবং বৃহস্পতিবার সূচক ২৩ পয়েন্ট বেড়লেও লেনদেন সেই তিনশ কোটি টাকার ঘরে। পুরো বছরের মধ্যে কখনো থেমে থেমে, কখনো ধারাবাহিক দর পতন ঘটেছে। নতুন কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি; আইপিও ‘শূন্য’ রেকর্ড হয়েছে ২০২৫ সালে।
শেষ দুই সপ্তাহের আট কর্মদিবসের মধ্যে ছয়দিনই দর পতন হয়েছে। এতে প্রধান সূচক হারিয়েছে ১৫১ পয়েন্ট। বাকি দুই দিনে সূচক বেড়েছে মাত্র ৭১ পয়েন্ট। শেষ প্রান্তিকে, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৮ কর্মদিবসের মধ্যে ২২ দিনে সূচকে ৮৩০ পয়েন্ট বেড়েছে। কিন্তু বাকি ৩৬ দিনে ১,৩৬২ পয়েন্ট কমেছে। পুরো ২৫৭ কর্মদিবসে ১২৮ দিনে সূচক কমেছে ৩,৬৪৬ পয়েন্ট, আর ১০৯ দিনে বেড়েছে ৩,৩১৩ পয়েন্ট। বছরের শেষে দর পতনের মাত্রা বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ‘শূন্য’ ঘোষণায়। ঋণ কেলেঙ্কারির পর এই ব্যাংকগুলোর একীভূত প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডাররা তাদের সম্পূর্ণ বিনিয়োগ হারিয়েছেন। আরও ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের ঘোষণায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে।
কার্যকর সংস্কার হয়নি:
অতীতের অনিয়মের জন্য দায়ীদের অর্থদণ্ড আরোপ হলেও আদায় হয়নি। বিএসইসির নেতৃত্বে যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অনেকাংশই বাস্তবে হয়নি। বিনিয়োগকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়ে আস্থা হারিয়েছেন। বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে বিনিয়োগকারীরা বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগ চেয়েছেন।
মার্জিন ঋণ, মিউচুয়াল ফান্ড এবং আইপিও বিষয়ক তিনটি বিধিমালা সংশোধনকে শেয়ারবাজার সংস্কারের মূল পদক্ষেপ মনে করা হলেও বিনিয়োগকারীদের হতাশা কমেনি। স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বাজারে কার্যকর সংস্কার হয়নি। বিএসইসি অংশীজন ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছে, ফলে বাজারে আস্থা তৈরি হয়নি।
ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের নেতিবাচক প্রবণতা একটি বা দুটি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। সার্বিকভাবে মানুষ বাজারের ব্যবস্থাপনায় হতাশ হয়েছেন। পাঁচ ব্যাংকের একীভূত প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা ছিল। তিনি মনে করেন, সরকার যেমন আমানতকারীদের ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার দায় নিয়েছে, বিনিয়োগকারীদের ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার দায় নেওয়া সম্ভব ছিল।
নির্বাচনের আশায় বিনিয়োগকারীরা:
নানা হতাশার মধ্যে কয়েকজন বিনিয়োগকারী জাতীয় নির্বাচনের আশায় বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করছেন। সরকার আইসিবিকে নতুন করে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, যার প্রভাব সাম্প্রতিক সময়ে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় দেখা গেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করতে চায় না। অন্তর্বর্তী সরকারে দেড় বছরে নতুন বিনিয়োগ হয়নি। নতুন রাজনৈতিক সরকার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নীতি নিলে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে–এটাই বিনিয়োগকারীদের আশা। তিনি মনে করেন, নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক পরিবেশ শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা শেষ হবে, যা শেয়ারবাজারে নতুন প্রেরণা আনবে। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরও তিনি সরাসরি নির্বাচনী মাঠে না থাকায় সংশয় ছিল। তবে নির্বাচনী আবহ শেয়ারবাজারকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাবে–এমন আশা বাজার সংশ্লিষ্টদের।

