সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সাল দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর জন্য সুখকর ছিল না। ব্র্যাক ইপিএলের বার্ষিক বাজার পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, বছরজুড়ে এই খাতের ফান্ডগুলোর মোট সম্পদ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা কমেছে।
২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত ফান্ডগুলোর মোট সম্পদ ছিল ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকায়। বর্তমানে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বড় ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে। এর অংশ হিসেবে এসইএমএল লেকচার ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ডকে বেমেয়াদিতে রূপান্তর করা হয়েছে। ভ্যানগার্ড এএমএল বিডি ফাইন্যান্স ও এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ডকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন মেয়াদি ফান্ড গঠন বা মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাবে না। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, কোনো ফান্ডের বাজারমূল্য যদি নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) চেয়ে ২৫ শতাংশের বেশি কমে যায়, তবে সেটিকে বাধ্যতামূলকভাবে বেমেয়াদিতে রূপান্তর করা হবে।
আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, ‘মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দুরবস্থার মূল কারণ আস্থার সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণে ফান্ডগুলোর নিট সম্পদমূল্য কমেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুর্বল শাসন, স্বচ্ছতার অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত শেয়ার নির্বাচনে ব্যর্থতা।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে তারল্য সংকট ও বিনিয়োগকারীদের অনীহা মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ দিয়েছে। ক্লোজড-এন্ড ফান্ডগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় বিনিয়োগকারীরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এতে আস্থাহীনতা বেড়েছে। যদি খাতকে শক্তিশালী না করা হয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতাও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
২০২৫ সালে ফান্ড ব্যবস্থাপকদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ক্যাপিটেক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। তাদের নিট সম্পদমূল্য ১১.৪ শতাংশ বেড়েছে। এর বিপরীতে বাকি সব ব্যবস্থাপকের সম্পদ কমেছে। রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের পতন সবচেয়ে বেশি, ১৭.৩ শতাংশ। এছাড়া সিএপিএম, এইমস, এলআর গ্লোবাল এবং আইসিবি এএমসিএলের ফান্ডের নিট সম্পদও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বছরের বিনিয়োগকারীর আস্থাহীনতা ফান্ডগুলোর ডিসকাউন্টে প্রতিফলিত হয়েছে। রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত ফান্ডগুলো সর্বোচ্চ ৬২.৫ শতাংশ ডিসকাউন্টে কেনাবেচা হয়েছে। এলআর গ্লোবাল, এসইএমএল এবং আইসিবি এএমসিএলের ফান্ডগুলোও বড় ডিসকাউন্টে লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে, সিএপিএম পরিচালিত ফান্ডগুলো সবচেয়ে কম ডিসকাউন্টে লেনদেন হয়েছে।
নেতিবাচক খবরের ভিড়েও কিছু ফান্ড বিনিয়োগকারীদের চড়া রিটার্ন দিতে সক্ষম হয়েছে। রিটার্নের তালিকায় শীর্ষে ছিল ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ৭৪.৪ শতাংশ রিটার্নের সঙ্গে। এরপর সিএপিএম বিডিবিএল ও ভ্যানগার্ড এএমএল বিডি ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ডের অবস্থান। এর বিপরীতে ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ৯.৩ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন দিয়ে লোকসানের তালিকায় শীর্ষে।
একক ফান্ড হিসেবে ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ডের নিট সম্পদমূল্য ১১.৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে গ্রামীণ ওয়ান: স্কিম টু এবং এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ডের সম্পদ ১.৯ শতাংশ কমেছে। এছাড়া আইসিবি থার্ড এনআরবি ও এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ডের সম্পদও সংকুচিত হয়েছে। ফলে পুরো খাতের নাজুক অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের কারণও পরিষ্কার। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাতের দুরবস্থার দায় কয়েকটি সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরাও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা না থাকায় দায় এড়িয়ে যেতে পারবে না। ফান্ডের আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন এবং সময়মতো লভ্যাংশ না দেওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হয়েছেন। অদক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবও বড় কারণ। অনেক ফান্ড বাজারের গড় রিটার্ন থেকে পিছিয়ে।
মানুষ ভালো মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করে। মিউচুয়াল ফান্ডে রিটার্ন কম হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সরাসরি শেয়ার কেনায় বেশি আগ্রহী। কিছু ফান্ডের রিটার্ন ৫ শতাংশের কম। অন্যদিকে, ব্যাংকে আমানতে ১০ শতাংশ বা তারও বেশি সুদ পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আস্থা অর্জনে ফান্ডের তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জরুরি। নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, সময়মতো ডিভিডেন্ড প্রদান এবং পেশাদার ফান্ড ম্যানেজার নিয়োগ প্রয়োজন। মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। যারা দক্ষ নয়, তাদের নিবন্ধন বাতিল করা জরুরি। দক্ষ ব্যবস্থাপনা রিটার্ন বাড়াতে সাহায্য করবে। বিএসইসির মাধ্যমে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। কোনো অনিয়ম হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তহবিল তছরুপ হলে তা দ্রুত উদ্ধার করতে হবে। আইনি জটিলতায় বিনিয়োগকারীর ক্ষতি হওয়া যাবে না, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

