৯টি দুর্বল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে নতুন ধাক্কার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া হলেও শেয়ারধারীদের প্রতি নজর দেওয়া হয়নি।
এবার একই দৃশ্যপট আবার ঘটছে। আটটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এনবিএফআই অবসায়নের পথে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা কার্যত পুরোপুরি উপেক্ষিত। কারণ তাদের শেয়ারগুলোতে সম্পদমূল্য ঋণাত্মক দেখানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা কিছুই পাবেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা প্রায় ১০১ কোটি শেয়ারে। শেয়ার শূন্য ঘোষণা করলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি দাঁড়াবে ১ হাজার ৮ কোটি টাকা। বাজারদরের হিসাবেও ক্ষতি কম নয়। বর্তমানে এসব শেয়ারের গড় দর এক টাকার নিচে। ফলে বিনিয়োগকারীদের ন্যূনতম ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ গত ৩০ নভেম্বর ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫-এর আওতায় এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও আভিভা ফাইন্যান্স—এই ৯ প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্স ছাড়া বাকি আটটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশই এই ৯ প্রতিষ্ঠানের দখলে। গত বছরের শেষে তাদের খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত আটটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকার বেশি। গড় খেলাপি হার ৮৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এই চরম অনিয়ম ও লুটপাটের ফল ভোগ করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। আটটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার বেশি। এর প্রায় ৬৯.৬৪ শতাংশ শেয়ার বিনিয়োগকারীদের হাতে, যার সংখ্যা ১০০ কোটি ৮৭ লাখের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অবসায়নযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারপ্রতি গড় নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ৯৫ টাকা। অর্থাৎ সব সম্পদ বিক্রি করলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী শেয়ারহোল্ডাররা কিছুই পাবেন না।
তবে বিশেষজ্ঞরা মানবিক ও ন্যায্যতার প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে বলছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন মনে করেন, সরকার যখন আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়। একই মত দিয়েছেন বিএএসএম ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। তাঁর মতে, বোর্ডের লুটেরা ও অনিয়মকারীদের শাস্তি নিশ্চিত না করে ৭০ শতাংশ শেয়ারধারীর শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা অবিবেচনাপ্রসূত। এতে বাজারে আস্থা ফিরবে না।
এদিকে ৯টি প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। সরকার প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে আমানত ফেরতের উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারিত হয়নি। বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণের কোনো পরিকল্পনা না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে। বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলো অবসায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। তবু পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক বিএসইসি পুরো বিষয়টিতে নীরব।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেছেন, অবসায়নের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা এলে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিএসইসি অনুরোধ করবে, যদি সরকারের বরাদ্দ থাকে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও দেখা হোক।

