দ্বিতীয় দফায় ধসের পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পুঁজিবাজারের অপরাধগুলো দ্রুত বিচারের জন্য ২০১৫ সালে গঠন করা হয় ‘বিএসইসি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল’।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো— ট্রাইব্যুনাল গঠনের এক দশকেও এখানে নতুন কোনো মামলা করতে পারেনি পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংস্থাটির দাবি, আইনি জটিলতার কারণেই তারা মামলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের বাজারধস সংক্রান্ত পুরোনো মামলাগুলোই কেবল স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হয়েছিল। গত ১০ বছরে নতুন কোনো মামলা এই আদালতে আনা সম্ভব হয়নি। বাস্তবে রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল ভবনটি এখন আর বিচারকক্ষ নয়, বরং অব্যবহৃত আসবাবপত্রের গুদামঘরে পরিণত হয়েছে।
মূলত জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই এগোচ্ছে বিএসইসি। তবে, এই কাঠামোয় প্রকৃত শাস্তি আর দায় নির্ধারণের কার্যকর পথ প্রায় বন্ধই রয়ে গেছে। তদন্তে অপরাধ শনাক্ত হলেও মামলা করা হয় না, আর যেসব মামলা আগে করা হয়েছিল সেগুলোর বড় অংশ বছরের পর বছর উচ্চ আদালতে ঝুলে রয়েছে। ফলে ট্রাইব্যুনাল থাকলেও বিচার কার্যত অনুপস্থিত।

স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বর্তমান অবস্থা
রাজধানীর পল্টনে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন ভবনে অকেজো ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে বিএসইসির স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কার্যালয়। একজন জেলা ও দায়রা জজসহ ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে এটি গঠিত হলেও কার্যক্রম না থাকায় কার্যালয়ে কাউকেই নিয়মিত যেতে হয় না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এজলাস রুমে কোনো কার্যক্রম নেই। আসামি বা কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষটিতে অফিসের অব্যবহৃত ও ভাঙাচোরা আসবাবপত্র রাখা হয়েছে। পুরোনো ফাইলগুলোর ওপর ধুলোবালি ও ময়লা জমে আছে।
বিনিয়োগকারী ও খাত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এমনকি পুঁজিবাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনেরাও এর বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন।
ইবিএল সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী আতাউল্লাহ নাঈম সূত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএসইসির যে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আছে, সেটিই তো আমরা জানি না। এখানে কী ধরনের কাজ হয়, সে সম্পর্কেও জানা নেই। শুধু আমি নই, আমার ধারণা বাজারের বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীই এটি জানেন না। কারণ, পুঁজিবাজারের এত এত অপরাধের বিচার যদি এখানে হতো, তবে সবাই এটি সম্পর্কে জানত।’
এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালীও জানান, ট্রাইব্যুনালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই।

কতটি মামলা ছিল এবং বর্তমান অবস্থা কী?
গত ১০ বছর ধরে কার্যত অচল বিএসইসির স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের ধসের ২৭টি মামলার বাইরে গত এক দশকে একটি নতুন মামলাও এখানে আসেনি। পুরোনো ২৭টি মামলার মধ্যে ১০টি নিষ্পত্তি হয়েছে, ১৪টি হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে চলমান এবং তিনটি স্থগিত রয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে কার্যকর কোনো মামলা নেই। ২০১৫ সাল থেকে চিফ জুডিশিয়াল আদালতে চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও সেগুলো স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে আনতে পারেনি বিএসইসি।
এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, ‘বর্তমানে বিএসইসি কোনো মামলা করতে চাইলে প্রথমে দায়রা আদালতে (সেশন কোর্ট) করতে হয়। দায়রা আদালত চাইলে বা বিএসইসি আবেদন করলে মামলাটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা সম্ভব। তবে, আগে আনা মামলাগুলো বর্তমানে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) থাকায় ট্রাইব্যুনাল এখন মামলাশূন্য।’
যে কারণে ট্রাইব্যুনাল গঠন
২০১০ সালে পুঁজিবাজার ধসের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে সর্বপ্রথম বিএসইসি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থছাড়ের শর্তেও এই স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ ছিল। তারই ধারাবাহিকতায়, অর্থ মন্ত্রণালয়কে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিল বিএসইসি।
এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে বিশেষ জজ হুমায়ুন কবিরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওই বছরের ১৬ মার্চ বিচারক হুমায়ুন কবির কাজে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ২১ জুন বিএসইসি স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় বলা হয়, ইনসাইড ট্রেডিং, প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য প্রদান, ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের অনিয়ম-জালিয়াতি এবং সিকিউরিটিজ আইন সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ অমান্য করলে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করবে বিএসইসি। যার বিচার হবে এই স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড, জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে ট্রাইব্যুনাল।
এ বিষয়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘এই ধরনের একটি আদালত করার আগে সরকারকে আরো বিচক্ষণ হওয়া উচিত ছিল। এখানে কী ধরনের মামলা আসবে, কতগুলো মামলা আসতে পারে এবং কতগুলো নিষ্পত্তি করা যাবে— এসব বিষয় আরো বিশ্লেষণ করেই আদালতটি গঠন করা উচিত ছিল। হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে তো লক্ষ লক্ষ মামলা জমে আছে। এখানে কেন মামলা নেই?’
কেন মামলা হচ্ছে না ও বিকল্প পথ কী?
বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, বিদ্যমান আইনে ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করতে পারে না বিএসইসি। এজন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী আসছে। একটি আইন হতে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে। আইনটি পাস হয়ে গেলে বিএসইসির মামলাগুলো সরাসরি স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা সম্ভব হবে।
তবে, স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে হাইকোর্টে দুদকের যেমন আলাদা বেঞ্চ রয়েছে, তেমনি একটি ‘স্পেশাল কোর্ট’ চালুর পরামর্শ দেন কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এ এম মাসুম। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের একটি আলাদা কোর্ট করে দিলে সিকিউরিটিজ আইন সংক্রান্ত যতগুলো মামলা রয়েছে তা এখানে এনে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে পুঁজিবাজারের জটবাঁধা মামলাগুলোর দ্রুত সমাধান হবে।’
মামলার পরিবর্তে জরিমানার পথে বিএসইসি
বর্তমান কমিশনের অধীনে গত দেড় বছরে ৩৫০-এর বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা প্রায় পুরোটাই জরিমানা-নির্ভর। এই সময়ে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কিছু মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে।
তবে, এই বিপুল পরিমাণ জরিমানার আদায়ের হার খুবই নগণ্য। আইনি মারপ্যাঁচে আদায়ের খাতা প্রায় শূন্য।
সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী মনে করেন, শুধু জরিমানা করে হিতে বিপরীত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জরিমানা আদায় তো হচ্ছে না, উল্টো বাজারে একটি অস্বস্তি ও ভীতি তৈরি হচ্ছে।’
বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের অপরাধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১৫ সালে গঠিত বিএসইসি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গত এক দশকে কার্যত অচল, নতুন কোনো মামলা গ্রহণ করতে পারেনি। আইনি জটিলতা ও মামলাশূন্যতার কারণে ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম নেই, ফলে বিএসইসি প্রধানত জরিমানা আর প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। সূত্র: ঢাকা পোস্টের এক্সক্লুসিভ

