দেশের পুঁজিবাজারে জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব নতুন নয়। নির্বাচন সামনে এলেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। সেই প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে বাজারে নতুন বিনিয়োগ আসে। পুরোনো বিনিয়োগকারীরাও বাড়তি অর্থ বিনিয়োগ করেন। পাশাপাশি নির্বাচন শেষে শেয়ারের দাম বাড়তে পারে—এই আশায় বাজারে ‘বাই-সেল’ তৎপরতাও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে শেয়ারের দরে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবারও শেয়ারবাজারে সেই ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে মোট বাজার মূলধন বেড়েছে ৯ হাজার ৫৮৮ কোটি ১০ লাখ টাকা।
গত এক সপ্তাহের লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সপ্তাহ শেষে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৪৩ পয়েন্টে। বড় মূলধনি কোম্পানির সূচক ডিএসই-৩০ বেড়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর অবস্থান এখন ২ হাজার ১ পয়েন্ট। শরিয়াহ সূচকে তুলনামূলক বেশি উত্থান দেখা গেছে। সূচকটি ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭২ পয়েন্টে। এসএমই খাতের সূচক ডিএসএমইএক্স দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে সপ্তাহ শেষে ৯৩৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস ২৯ জানুয়ারি বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইতেই বাজার মূলধন বেড়েছে ৪ হাজার ৪৭৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিদায়ী সপ্তাহে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। সপ্তাহ শেষে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৭৩১ পয়েন্টে। সিএসই-৩০ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সিএসসিএক্স সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সিএসআই সূচক বেড়েছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে এসএমই খাতের সূচক এসইএসএমইএক্স দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ পয়েন্টে।
গত বৃহস্পতিবার সিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৭ লাখ ৬ হাজার ৫৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস ২৯ জানুয়ারি বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ১ হাজার ৪৬৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ফলে এক সপ্তাহে সিএসইতে বাজার মূলধন বেড়েছে ৫ হাজার ১১২ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
লেনদেনের চিত্রেও ইতিবাচকতা দেখা গেছে। গত সপ্তাহে ডিএসইতে ৩৮৮টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে দর বেড়েছে ২৩১টির। কমেছে ১৪১টির। অপরিবর্তিত ছিল ১৭টির। তবে ২৪টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটে কোনো লেনদেন হয়নি। একই সময়ে সিএসইতে ২৬৯টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়। দর বেড়েছে ১৬০টির। কমেছে ৮৭টির। অপরিবর্তিত ছিল ২২টির।
শেয়ারবাজারের এই ধারাবাহিক উত্থান নিয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, এই ইতিবাচক ধারা আরও কিছুদিন থাকতে পারে। এরপর বাজার কোন পথে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণের ওপর।
তিনি বলেন, নতুন সরকার অর্থনীতি কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে, সেটাই পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যবস্থাপনা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে সংস্কার আনতে হবে। নতুন আইপিও বাজারে আনতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিমা খাতকে সক্রিয় করতে হবে। মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নীতি কার্যকর করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, মার্জিন ঋণের সুদহার কমানো দরকার। ব্যবসায়ী মহলের আস্থা অর্জন করতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারলে পুঁজিবাজারও স্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হবে।
তার মতে, ব্যবসার পুঁজি সংগ্রহে ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে সামনে আনতে হবে। তাতে বাজারের এই গতি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, বিনিয়োগকারীরা মূলত নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা যত কমছে, বাজার তত শক্তিশালী হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি তাদের ইশতেহারে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, দলটি বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন।
মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, শেয়ারবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম রয়েছে। নির্বাচনের পর যদি পুঁজিবাজারবান্ধব সরকার আসে, তাহলে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কাজে লাগিয়ে শেয়ারবাজারকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

