দেশের শেয়ারবাজারে দেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম দেড় মাসে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ২৬০টি করে নতুন বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব যুক্ত হয়েছে। এ সময়ে মোট ৮ হাজার ৩৩৪টি নতুন বিও হিসাব বেড়েছে।
তবে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমতে শুরু করেছে। চলতি বছরের ৩২ কার্যদিবসে তাদের বিও হিসাব কমেছে ৪৪৩টি। অর্থাৎ, দেশি বিনিয়োগকারীর উদ্দীপনা বাড়লেও বিদেশি ও প্রবাসীদের বাজার ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, “দেশি বিনিয়োগকারীরাই আমাদের পুঁজিবাজারের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু নীতিগত অসঙ্গতি, দীর্ঘদিনের বাজার অস্থিরতা ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে অনেকেই আস্থা হারিয়েছেন। বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া বাজারে স্থায়ী গতি আসবে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্থিতিশীল নীতিমালা বিবেচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। আমাদের বাজারে এসব উপাদান আরও শক্তিশালী করতে হবে। নিয়ম-কানুনের ঘন ঘন পরিবর্তন বিদেশিদের বিনিয়োগের জন্য নিরুৎসাহিত করছে।”
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এই প্রবণতা শুরু হয়। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। এর পর থেকে মোট ১২ হাজার ৪০৬টি বিও হিসাব কমেছে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর তথ্যে, বর্তমানে শেয়ারবাজারে মোট বিও হিসাব ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০৯টি। ২০২৫ সালের শেষের তুলনায় এটি বেড়েছে ৮ হাজার ৩৩৪টি। বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বর্তমানে ৪৩ হাজার ১০৬টি বিও হিসাব আছে, যা চলতি বছরে ৪৪৩টি কমেছে। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ১৪ জন বিদেশি বা প্রবাসী বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ত্যাগ করেছেন।
বিও হলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংকে খোলা একটি হিসাব। বিনিয়োগকারীরা এই হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করেন এবং সিডিবিএল এ তথ্য রক্ষণাবেক্ষণ করে।
শেয়ারবাজারে দেশি বিনিয়োগকারীর বৃদ্ধির ধারা উদ্বেগ কমিয়ে দিচ্ছে, তবে বিদেশি ও প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য নীতি ও স্বচ্ছতা উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বিনিয়োগকারীর অবস্থা:
বিদেশি ও প্রবাসীরা দেশের শেয়ারবাজার ছাড়লেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সিডিবিএলের তথ্যে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীর নামে বিও হিসাব ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬৫৯টি, যা ২০২৫ সালের শেষে ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ চলতি বছরে দেশি বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৬৩৬টি। এ হিসেবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ২৭০টি নতুন স্থানীয় বিও হিসাব যুক্ত হয়েছে।
তবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়লেও সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। ২০২৪ সালের শুরুতে শেয়ারবাজারে মোট বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। এখন এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০৯টিতে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৪২টি বিও হিসাব কমেছে। এই হিসাবগুলো দেখাচ্ছে, যদিও স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে, তবুও মোট বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগকারী বাজার ত্যাগ করেছেন।
সব ধরনের বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে:
বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে পুরুষ বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দৃঢ় অবস্থানে আছে। সিডিবিএলের তথ্যে দেখা গেছে, পুরুষ বিনিয়োগকারীর নামে বিও হিসাব ১২ লাখ ৪০ হাজার ৫৩০টি, যা ২০২৫ সালের শেষের তুলনায় ৬ হাজার ৭৮৭টি বেশি।
নারী বিনিয়োগকারীর অংশও সামান্য বেড়েছে। বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব ৩ লাখ ৯০ হাজার ২৩৫টি, যা ২০২৫ সালের শেষের তুলনায় ১ হাজার ৪০৬টি বেড়েছে। শেয়ারবাজারে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। কোম্পানির নামে বিও হিসাব বর্তমানে ১৭ হাজার ৯৪৪টি, যা গত বছরের তুলনায় ১৪১টি বেশি।
বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ধরনে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একক নামে বিও হিসাব ১১ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৩টি, যা চলতি বছরে ৭ হাজার ৬২৮টি বেড়েছে। অন্যদিকে যৌথ নামে বিও হিসাব ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪২২টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৬৫টি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই তথ্যগুলো দেখাচ্ছে, দেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুরুষ এবং নারী উভয়ের অংশগ্রহণ বাড়ছে, কোম্পানিও বাজারে আরও সক্রিয় হচ্ছে। একক ও যৌথ নামে বিও হিসাবের বৃদ্ধি বাজারের সামগ্রিক গতিশীলতা নির্দেশ করছে।

