পুঁজিবাজারে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত ফাইন ফুডস লিমিটেডের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগে চারজন বিনিয়োগকারী ও দুই প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি চৌষট্টি লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন।
বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ জানুয়ারিতে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে। আদেশ অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানা কমিশনের অনুকূলে জমা দিতে হবে। বিএসইসির তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ফাইন ফুডসের শেয়ার লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত চালিয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ফাইন ফুডসের শেয়ারের সমাপনী দর ছিল ১৫৫ টাকা ৮০ পয়সা। আর ২৪ ডিসেম্বর শেয়ারটির দর বেড়ে দাঁড়ায় ২১৮ টাকা ৬০ পয়সায়। ডিএসইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেয়ারের এই উত্থান কারসাজি সম্পর্কিত। তদন্ত শেষে রিপোর্ট বিএসইসিতে জমা দেওয়া হয়। শুনানি শেষে কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে জরিমানা করেছে।
শেয়ার কারসাজির দায়ে পাঁচ ব্যক্তিকে আলাদা আলাদা জরিমানা করা হয়েছে। অভিজিত দাশকে ৫৮ লাখ টাকা, মো. সানোয়ার খানকে ২৫ লাখ, আসমাউল হুসনাকে ৯ লাখ, মো. আনোয়ার পারভেজ খানকে ২ লাখ এবং ফাইন ফুডসের পরিচালক মো. সালাউদ্দিন হায়দারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মো. সানোয়ার খান সিটি ব্যাংক পিএলসির পুঁজিবাজার বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। আসমাউল হুসনা তার স্ত্রী এবং মো. আনেয়ার পারভেজ খান ভাই।
সাথে এ কারসাজির ঘটনায় এসএসএস হোল্ডিংস লিমিটেডকে ১৭ লাখ এবং সিটি ব্যাংককে ৪২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরে ফাইন ফুডসের শেয়ার নিয়ে কারসাজির গুঞ্জন ছিল। ব্যবসার উন্নতি নয়, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়েছে। তদন্তে কোম্পানির শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
গত সরকারের সময় এমন কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বিএসইসি, খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে, যেকোনো ধরনের কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফাইন ফুডসের শেয়ার দর উর্ধ্বমুখী হলেও ব্যবসার পারফরম্যান্স ভালো নয়। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে শেয়ার দর নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যয় কমিয়ে, মুনাফা ও সম্পদ বেশি দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়টি নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প মূলধনি ফাইন ফুডসের শেয়ার ২০০ টাকার ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অভিযোগ, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সরাসরি কারসাজিতে সহযোগিতা করেছে। তারা কৃত্রিম হিসাবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শেয়ার পরিচালনায় সহায়তা করেছে। বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টরা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে বেড়ে যায়। ২০২৩ সালের ১ মার্চ শেয়ারের দাম ছিল ৬০.৯০ টাকা। ২৫ জুন এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ টাকায়। চার মাসে দাম বেড়ে হয় ৬২.১০ টাকা বা ১০১.৯৭ শতাংশ।
বিএসইসি জানায়, ২০২৩ সালের ২ মার্চ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজির জন্য মোহাম্মদ শামসুল আলমকে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সহযোগী সাজিয়া জেসমিনকে ৪৯ লাখ, সুলতানা পারভিনকে ১১ লাখ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে ১ লাখ, এএএ এগ্রো এন্টারপ্রাইজকে ৭৫ লাখ এবং আরবিম টেকহো লিমিটেডকে ২৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই বিষয়ে বিএসইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
ফাইন ফুডস লিমিটেড ২০০২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৮। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্যোক্তা পরিচালকের হাতে ১৫.২৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৫.২৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৯.৫০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে পরিচালনা পর্ষদ। ১৫ জানুয়ারি উচ্চ মূল্যের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য চালু করা হয়। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক ও অর্ধবার্ষিক অনিরীক্ষিত প্রতিবেদনে কোম্পানি অস্বাভাবিক মুনাফা দেখিয়েছে।

