বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ ধারা এখনও থেমে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ এবং বীমা খাতের শীর্ষ পদে পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এই অনিশ্চয়তা বাজারকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
প্রতিদিনই বিএসইসি চেয়ারম্যান পদে নতুন প্রার্থী নিয়ে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নাম শুনছেন, কিন্তু দিনশেষে কোনো নিয়োগ চূড়ান্ত হচ্ছে না। বর্তমান চেয়ারম্যানও এখনও ‘পদত্যাগ না করে’ দায়িত্ব পালন করছেন। এর ফলে ঘোলাটে পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার আরও নিম্নমুখী হচ্ছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২০৯ পয়েন্ট কমে ৫৩২৫ পয়েন্টে নেমেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন হবে কি হবে না, তা সরকারকে দ্রুত স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে, বর্তমান চেয়ারম্যানের ভবিষ্যৎ নিয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। যদি তাকে দায়িত্বে রাখা হয়, তবে তিনি বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী উদ্যোগ নেবেন, তা জানানো জরুরি। না হলে পুঁজিবাজারের পতন আরও গভীর হতে পারে।
অংশীজনরা দাবি করছেন, বাজারে চলমান ধস ঠেকাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার নেতৃত্ব নিয়োগ করা জরুরি। তারা বলেন, অনভিজ্ঞ কাউকে দায়িত্ব দিলে বাজার বোঝার আগেই সময় নষ্ট হয়। তাই স্বচ্ছ ও দক্ষ নেতৃত্ব বাছাই করতে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সার্চ কমিটি গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সক্ষম নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য কমিটি গঠনের পরামর্শ
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিনিয়োগকারী ও বাজার-অংশীজনরা বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবি করে আসছেন। প্রথমবারের মতো তারা চাচ্ছেন সংকটকালীন সময়ে পুঁজিবাজার পরিচালনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে এই দায়িত্বে নেওয়া হোক। বাজার-অংশীজনরা বলেন, সাবেক আমলা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ দিলে বাজারের ইকোসিস্টেম বোঝার জন্য কয়েক বছর সময় লেগে যায়। এতে বাজারের উন্নয়নে তারা প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারেন না।
তাদের পরামর্শ, চেয়ারম্যান নির্বাচনে বিচার্য প্রধান গুণ হতে হবে ‘দক্ষতা’ এবং ‘সততা’। তারা বলেন, “শুধু সততা থাকলেই বাজারে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। দক্ষ হলেও স্বার্থের সংঘাত থাকলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসির প্রতিনিধি, স্টক এক্সচেঞ্জ, বাজার-অংশীজন, তালিকাভুক্ত কোম্পানি সংগঠন বিএপিএলসি, এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ সব সংশ্লিষ্ট পক্ষ মিলিয়ে একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করা উচিত।”
ব্রোকারেজ হাউজগুলো কী বলছে:
পুঁজিবাজারের বড় অংশীজন ব্রোকারেজ হাউজগুলো দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে লোকসানের সঙ্কটে ভুগছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়া এবং ধারাবাহিক ক্ষতির কারণে গত দেড় বছরে শতাধিক হাউজের শাখা ও মূল অফিস বন্ধ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব বাজারে আস্থা ফিরিয়ে ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে টিকে থাকার পথ দেখাবে। নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনে তাই সব পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ব্রোকারেজ হাউজগুলোর।
ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা চান, এবার এমন একজন অভিজ্ঞ নেতা নিয়োগ করা হোক, যিনি সংকটকালীন সময়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তাদের মতে, মানুষের বেঁচে থাকার মতো পুঁজিবাজারেরও কিছু মৌলিক চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- মানসম্মত আইপিও’র সঠিক মূল্য নির্ধারণ
- পণ্যের বৈচিত্র্য আনা
- মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ড মার্কেটের গভীরতা বাড়ানো
বাজারের এই মৌলিক চাহিদা বোঝার ক্ষমতা এবং কার্যকর প্রণোদনা দিতে পারা নেতাকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো উচিত। ডিবিএ’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া উচিত যিনি বাজার-সংক্রান্ত সার্বিক জ্ঞান রাখেন। বাংলাদেশের বাজার থেকেও হতে পারে, আবার বিশ্বের বড় মার্কেটে কাজের অভিজ্ঞ কেউও হতে পারেন। আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রীও আগে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার কথা। না হলে, দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বাজারে কাজ করা অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়াই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে।”
এক শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজের সিইও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শেয়ারবাজার বিশ্বের অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা। যারা এই বাজার সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন, তাদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। বিশ্বজুড়ে বেসরকারি খাত থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান নির্বাচনের প্র্যাক্টিস আছে। বাংলাদেশেও এটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা যেতে পারে। সংকটকালে এতে ভালো ফল আশা করা যায়।” তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, মালয়েশিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে সিইও ও ডেপুটি সিইও ব্রোকারেজ হাউজ থেকে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তা ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
মার্চেন্ট ব্যাংকাররাও চাইছেন যোগ্য ও দক্ষ চেয়ারম্যান
পুঁজিবাজারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। বাজারের স্বার্থে তারা চাইছেন অভিজ্ঞ নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষে থাকুক। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) এর সভাপতি ইফতেখার আলম বলেন, “যদি অভিজ্ঞ কেউ নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বে আসেন, তা বাজারের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত হবে। দীর্ঘমেয়াদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং মৌলিক পরিবর্তন আনার মাধ্যমে নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সক্ষম হবেন।”
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ডিএসইএক্স সূচক ৪৫০ পয়েন্টের বেশি কমেছে, এবং প্রায় ৮৭ হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। লেনদেনের খরার কারণে শতাধিক ব্রোকারেজ হাউজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে নেমেছেন। এই পরিস্থিতিতে সাইফুল ইসলাম, তানভীর গণি সহ কিছু বাজার বিশেষজ্ঞ এবং কয়েকজন সাবেক আমলা ও শিক্ষকের নাম নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও সুমিত পোদ্দার বলেন, “বাজারের প্রকৃত উন্নয়নে যিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তাকেই নিয়োগ দেওয়া উচিত। শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তন করলেই রাতারাতি বাজারের চিত্র বদলে যাবে না। বাজার সংশ্লিষ্ট কাউকে দায়িত্ব দিলে তিনি সহজেই বাজারের গতিপ্রকৃতি বা ‘পালস’ বুঝতে পারবেন। তবে বাজারের বাইরে থেকেও দক্ষ কেউ দায়িত্ব নিতে পারেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেতৃত্বের সক্ষমতা—সংকটকালীন সময়ে তিনি কতটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, “যেমন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদা থাকে, পুঁজিবাজারেরও কিছু মৌলিক চাহিদা রয়েছে। বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফেরাতে এখন এগুলো পূরণ করা জরুরি। মূল চাহিদাগুলো হলো—
- মানসম্মত নতুন পণ্য আনা এবং বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা
- আইপিওতে শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ
- মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিকে বাজারে আনতে প্রণোদনা দেওয়া
- মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ড মার্কেটের পরিধি ও গভীরতা বাড়িয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো
যিনি এই চাহিদাগুলো বুঝতে পারবেন এবং পূরণে কার্যকর হবেন, তাকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো উচিত।”
সম্পদ ব্যবস্থাপকরা কেমন নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেন
পুঁজিবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান, যাদের ব্যবসা পুরোপুরি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তারা মনে করছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হলে প্রার্থীর শুধু উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা বা সততা যথেষ্ট নয়। বরং দীর্ঘ বছরের বাস্তব বাজার অভিজ্ঞতা থাকা অপরিহার্য। বাজারের গভীরতা ও জটিলতা বোঝেন এমন অভিজ্ঞ নেতৃত্বই বর্তমান সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সিইও শহিদুল ইসলাম বলেন, “বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদ অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে বহুমাত্রিক প্রতিভা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ব্যক্তিই কার্যকর হতে পারেন। অনভিজ্ঞ কেউ দায়িত্বে এলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। একজন অভিজ্ঞ নেতা জানেন বাজারের কোন দিকে নজর দেওয়া জরুরি। অনভিজ্ঞ ব্যক্তি অন্যের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা বাজারের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।”
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান বলেন, “নেতৃত্ব বাছাইতে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রার্থী বাজার-সংশ্লিষ্ট হতে পারেন, কর্পোরেট সেক্টর থেকে আসতে পারেন, আবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাও হতে পারেন। মূল বিষয় হলো— তার দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা। তাকে নিয়োগ দিলে অবশ্যই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে হবে, যাতে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে না পারে।” বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, পুঁজিবাজারের প্রধান মৌলিক চাহিদাগুলো হলো:
- মানসম্মত নতুন পণ্য আনা এবং বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা
- আইপিওতে শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ
- মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিকে বাজারে আনতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া
- মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ড মার্কেটের পরিধি ও গভীরতা বাড়িয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো
বিএমবিএ সভাপতি ইফতেখার আলম বলেন, “বাজারের এই সংকটকালীন চাহিদা বুঝে এবং পূরণে সক্ষম ব্যক্তিকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে বসানো উচিত।” এক শীর্ষস্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির সিইও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “স্বার্থের সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে ম্যানেজ করা যায়, কিন্তু দক্ষতার ঘাটতি ম্যানেজ করা যায় না। একজন অদক্ষ ব্যক্তির চেয়ে ‘দক্ষ’ কিন্তু সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতে জড়ানো ব্যক্তিকেই আমি বেছে নেব। তবে দক্ষ ও স্বার্থমুক্ত ব্যক্তিকে বাছাই করা সবচেয়ে ভালো।”
কেন শীর্ষ পদে পরিবর্তনের কথা উঠছে
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএসইসি’র নেতৃত্বে আসা তিনজন চেয়ারম্যান এবং বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সময়ে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেন এবং শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের সময়ে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা ঘটে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এই ধরনের বিতর্কিত অভিযোগে জড়াননি, তবে তিনি দায়িত্ব পালনে অদক্ষ এবং বাজারে অস্থিরতা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার সময়ে পুঁজিবাজার বিভিন্নভাবে পিছিয়ে গেছে।
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার দিনে (১৯ আগস্ট ২০২৪) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৫৭৭৫ পয়েন্ট ছিল। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সূচক ৪৫০ পয়েন্ট কমে ৫৩২৫ পয়েন্টে নেমেছে। একই সময়ে লেনদেন মাত্র ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে, যা পুরো শেয়ারবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে প্রায় ৮৭ হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। লেনদেন খরায় শতাধিক ব্রোকারেজ হাউজের শাখা ও মূল অফিসও বন্ধ হয়ে যায়। দুই স্টক এক্সচেঞ্জে বড় অঙ্কের পরিচালন লোকসান হয়েছে। বাজারে আস্থা হারানো বিনিয়োগকারীরা অবরোধ ও বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে মাকসুদের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। তবুও তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে পদে বহাল আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান বলেন, “বিএসইসির নেতৃত্ব বাছাইয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি কাজের অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি। প্রার্থী বাজার-সংশ্লিষ্ট হতে পারেন, কর্পোরেট সেক্টর থেকে আসতে পারেন, আবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাও হতে পারেন। মুখ্য বিষয় হলো— পুঁজিবাজার নিয়ে তার দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা। যদি বাজার-সংশ্লিষ্ট কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাকে অবশ্যই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে হবে, যাতে ‘স্বার্থের সংঘাত’ প্রশ্ন না আসে।”
নতুন নেতৃত্বে আলোচনায় যারা
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, বিএসইসি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের নাম সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে। তালিকায় রয়েছেন সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কমিশনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং বাজার-অংশীজন। আবার কিছু ব্যক্তির নাম আলোচনায় এসেছে, যদিও তারা আগ্রহী নন।
আলোচনায় রয়েছেন:
- সাইফুল ইসলাম – ডিএসই’র সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডিবিএ সভাপতি, ৩০ বছরের বাজার অভিজ্ঞতা
- তানভীর গণি – এশিয়ার বৃহত্তম হেজ ফান্ড টাইবোর্ন ক্যাপিটাল এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি
- অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাদা দলের আহ্বায়ক
- অধ্যাপক মো. আল-আমিন – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
- মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী – চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালক ও লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ লিমিটেডের এমডি
- ড. এম মাসরুর রিয়াজ – পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান
এছাড়া আলোচনায় আছেন বিএসইসি’র সাবেক কমিশনার এটিএম তারিকুজ্জামান, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পদত্যাগ করেছিলেন। সম্প্রতি এই তালিকায় যোগ হয়েছেন সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ফরিদ ইসলাম। সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এই সম্ভাব্য প্রার্থীদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং বাজার-সংক্রান্ত জ্ঞান বিবেচনা করবে।

