দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যবসা থেকে আয় ও মুনাফা কিছুটা বাড়লেও আর্থিক ব্যয়ের চাপ আরও দ্রুত বেড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরি লিমিটেড ২০২৫ সালের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৪৯টি কোম্পানির তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট আয় আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ। কিন্তু আর্থিক ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মূলত ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিগুলোর এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে ভোগ কমেছে। পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। এই দুই চাপ মিলেই ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলছে এবং তা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হচ্ছে।
খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানিগুলোর আয় সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রকৌশল খাতে আয় বেড়েছে ১১ শতাংশ এবং সিরামিক ও সিমেন্ট খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। অন্যদিকে কাগজ ও মুদ্রণ খাত সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। এ খাতে আয় কমেছে ৪২ শতাংশ।
উচ্চ সুদের কারণে কয়েকটি খাতে আর্থিক ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে ছয়টি খাতের কোম্পানির আর্থিক ব্যয় দুই অঙ্কের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে কাগজ ও মুদ্রণ খাতে ব্যয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫৫ শতাংশ। টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ। সিমেন্ট খাতে ৩৮ শতাংশ, চামড়া খাতে ৩০ শতাংশ, সিরামিক খাতে ২৩ শতাংশ এবং খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে ১৬ শতাংশ আর্থিক ব্যয় বেড়েছে।
বছরের শেষ প্রান্তিক, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক চিত্র আরও চাপের মুখে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে এ সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা কমে যায়। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ওই প্রান্তিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় কমেছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নিট মুনাফা কমেছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু খাত ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। শেষ প্রান্তিকে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানিগুলোর আয় বেড়েছে ১১ শতাংশ। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ। ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ। টেলিযোগাযোগ খাতে আয় বেড়েছে ৪ শতাংশ, সিরামিক খাতে ৩ শতাংশ এবং বিবিধ খাতে ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে কাগজ ও মুদ্রণ খাতে আয় কমেছে ৩১ শতাংশ। প্রকৌশল খাতে আয় কমেছে ২০ শতাংশ। চামড়া খাতে ১৫ শতাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১২ শতাংশ আয় কমেছে।
মুনাফার দিক থেকেও চিত্র বেশ বৈচিত্র্যময়। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে মাত্র তিনটি খাতে নিট মুনাফা বেড়েছে। বিবিধ খাতে মুনাফা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। আর ওষুধ ও রসায়ন খাতে মুনাফা বেড়েছে ৬ শতাংশ।
অন্যদিকে কয়েকটি খাতে মুনাফা বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে। সিরামিক খাতে মুনাফা কমেছে ৩১৮ শতাংশ। কাগজ ও মুদ্রণ খাতে কমেছে ১২৬ শতাংশ। বস্ত্র খাতে ৮৮ শতাংশ, সিমেন্ট খাতে ৮৫ শতাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২৫ শতাংশ এবং সেবা ও আবাসন খাতে ২০ শতাংশ মুনাফা কমেছে।
এ সময় আর্থিক ব্যয়ের চাপও অব্যাহত ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে সাতটি খাতে আর্থিক ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে সিরামিক খাতে ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ। সিমেন্ট খাতে বেড়েছে ৩২ শতাংশ। টেলিযোগাযোগ খাতে ১৫ শতাংশ, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে ৯ শতাংশ এবং কাগজ ও মুদ্রণ খাতে ৬ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ব্যবসার আয় ও মুনাফা কিছুটা বাড়লেও উচ্চ সুদহার ও ব্যয়ের চাপের কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

