বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আকারে বড় এবং কার্যক্রমে প্রাণবন্ত। তবে এই বাজারের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করছে। অল্প কয়েকটি বড় কোম্পানি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। প্রতিযোগিতার বদলে তাদের মধ্যে সমন্বয় বেশি দেখা যায়। এর ফলে সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে তৈরি হয় একধরনের অঘোষিত প্রভাব বলয়।
এই চিত্রটি সামনে আসে গত ১৫ মার্চ প্রকাশিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর একটি বিশ্লেষণে। এতে সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভোজ্যতেল, খেজুর, এলপিজি, পেঁয়াজ, ডিম, আলু ও মরিচের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে শুধু আমদানিতেই নয়, বরং সংরক্ষণ, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ডিলার নেটওয়ার্ক, পাইকারি ও খুচরা বিপণন—পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই নিয়ন্ত্রণ করছে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান।
এই আধিপত্যের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। অনেক সময় সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ দাম বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে।
এ পরিস্থিতি শুধু ভোক্তাদের জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়লে বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। তখন ধারণা তৈরি হয়, বাজার আর প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে চলছে না; বরং নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে।
সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। তারা সহজে ঋণ, গুদাম, পরিবহন বা সরবরাহ চেইনে প্রবেশাধিকার পায় না। এসব খাত বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ছোট ব্যবসাগুলো টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হয়।
সময়ের সঙ্গে এই প্রবণতা ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’-এর দিকে ধাবিত করে। যেখানে একটি সুস্থ অর্থনীতিতে সফলতা আসে দক্ষতা ও উদ্ভাবন থেকে, সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থায় সফলতা নির্ভর করে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। ফলে বিষয়টি শুধু পণ্যমূল্য বৃদ্ধির নয়, বরং ন্যায্যতা, ব্যবসার স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রযুক্তি কি কার্যকর সমাধান হতে পারে
যেখানে সমস্যা অস্বচ্ছতা, সেখানে সমাধানের শুরু হতে পারে স্বচ্ছতা দিয়েই। এই জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এটি আইন বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিকল্প নয়, তবে বাজারকে আরও স্বচ্ছ ও নজরদারির আওতায় আনতে পারে। বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থার অনেক তথ্যই অদৃশ্য থাকে। আমদানি, গুদাম মজুত বা বাজারে পণ্য ছাড়ার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রায়ই পূর্ণাঙ্গ তথ্য পায় না। ভোক্তারা দেখতে পায় কেবল ফলাফল—সংকট ও উচ্চমূল্য। একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এই অস্বচ্ছতা কমাতে পারে।
প্রতিটি পণ্যের চালানকে একটি ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনা যেতে পারে, যেমন কিউআর কোড বা ব্যাচ নম্বর। বন্দর থেকে শুরু করে পরিবহন, গুদাম, পুনঃপ্যাকেজিং এবং খুচরা বিক্রি—প্রতিটি ধাপে এই কোড ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।
সহজ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা পণ্য গ্রহণ, মজুত, মূল্য ও ছবি আপলোড করতে পারবে। এতে প্রতিটি লেনদেনের সময়, স্থান ও পরিমাণের একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। বিশেষ করে পুনঃপ্যাকেটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে মূল চালানের সঙ্গে ছোট প্যাকেটগুলোর সম্পর্ক বজায় রাখা গেলে পরিমাণের সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে। কোনো অমিল দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সতর্ক সংকেত পাওয়া সম্ভব হবে।
এই ব্যবস্থায় রিয়েল-টাইম বা প্রায় তাৎক্ষণিক তথ্য আপডেট নিশ্চিত করা গেলে বাজার আরও স্বচ্ছ হবে। পরিবহন ব্যবস্থায় জিপিএস যুক্ত করা, গুদামের নিয়মিত তথ্য আপডেট এবং ডিজিটাল চালান ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্যের গতিপথ সহজে অনুসরণ করা যাবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে স্মার্টফোন, কিউআর কোড, ই-চালান ও ক্লাউডভিত্তিক ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করেই বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। পরবর্তীতে বড় অবকাঠামোতে উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা যেতে পারে। ডেটা প্রবাহ শুরু হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহের অসামঞ্জস্য দ্রুত শনাক্ত করতে পারবে। একই সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত আচরণও নজরে আসবে, যা আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
এ প্রযুক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থায়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশ সহজ হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত একটি ড্যাশবোর্ড চালু করা হলে দৈনিক মূল্য, সরবরাহ পরিস্থিতি ও বাজার প্রবণতা জানা সহজ হবে। এতে গুজব বা অযথা আতঙ্ক কমবে। একই সঙ্গে ভোক্তা ও খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকলে তা বিশ্লেষণ করে কারসাজির প্রবণতা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী আইন ও কার্যকর প্রয়োগ। বড় ব্যবসায়ী ও গুদামগুলোর জন্য তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভুয়া তথ্য, লেবেল জালিয়াতি বা মজুত গোপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে ডিজিটাল তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মিল নিশ্চিত করা জরুরি। এআইনির্ভর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা বাজারে স্বচ্ছতা আনতে পারে। এটি কারসাজি কমাবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুযোগ বাড়াবে এবং ভোক্তাদের সুরক্ষা দেবে।
তাৎক্ষণিকভাবে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও, এই উদ্যোগ নিলে নিত্যপণ্যের বাজারে অদৃশ্য আধিপত্য টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন হবে। ন্যায্য মূল্য, সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়ের জন্য এখন প্রযুক্তিনির্ভর বাজার ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি।

