প্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবীটাই যেন আপনার হাতের মুঠোয়। যেকোনো প্রয়োজনে উত্তর জানতে চ্যাটজিপিটিকে একটি প্রশ্ন করুন, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পেয়ে যাবেন উত্তর। ব্যবহারকারীর চোখে এটি একটি “বিনামূল্যের” সেবা। কিন্তু সেই মুহূর্তে পর্দার আড়ালে চলে বিশাল এক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। আপনার প্রশ্নটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৌঁছে যায় বিশ্বের কোনো একটি তথ্যকেন্দ্রে, যেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী জিপিইউ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনাকারী বিশেষ যন্ত্র, সার্ভার, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং বিশাল অবকাঠামো একসঙ্গে কাজ করে। এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে রয়েছে বিদ্যুৎ খরচ, যন্ত্রপাতির ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মী খরচ এবং হাজার হাজার টন পানি। ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে পরিবেশগত চাপ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যেখানে ব্যবহারকারী অধিকাংশ সময় কোনো অর্থ প্রদান না করেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন, সেখানে এই বিপুল খরচের বোঝা বহন করছে কে?
এআই কি শুধু প্রযুক্তি, নাকি বিশাল ব্যবসা?
বাস্তবে এই বিল সরাসরি ব্যবহারকারীর পকেট থেকে আসে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন উপায়ে এই খরচ বহন করে। এর একটি অংশ আসে অর্থপ্রদানের ভিত্তিতে নেওয়া সদস্যপদ থেকে, যেখানে উন্নত সুবিধার জন্য ব্যবহারকারীরা মাসিক বা বার্ষিক অর্থ প্রদান করেন। আরেকটি বড় উৎস হলো প্রোগ্রাম সংযোগ সেবা, যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা ব্যবহারের জন্য কোম্পানিগুলোকে অর্থ প্রদান করে। পাশাপাশি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশেষ চুক্তি থেকেও আসে উল্লেখযোগ্য আয়।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো – আয় এবং লাভ এক জিনিস নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করলেও তাদের ব্যয় অনেক সময় তার চেয়েও বেশি হতে পারে। একটি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরি করতে প্রয়োজন হয় হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র, বিশাল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, গবেষক দল এবং দীর্ঘ সময়ের প্রশিক্ষণ। কিন্তু মডেল তৈরি হওয়ার পরেও খরচ শেষ হয় না কেন?
প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দিতে যে পরিচালন ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, সেটিও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অর্থাৎ একজন ব্যবহারকারী যত বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন, কোম্পানির সার্ভার, বিদ্যুৎ এবং কম্পিউটার ব্যবহারের খরচ তত বাড়তে থাকে।
এই অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি বড় উদ্বেগ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার স্থায়িত্ব। বর্তমানে অনেক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ওপর বড় বিনিয়োগ করছে। তাদের ধারণা, আজকের বিনামূল্যের ব্যবহারকারীরাই ভবিষ্যতের অর্থপ্রদানকারী গ্রাহকে পরিণত হবে।
বিশাল বিনিয়োগ কখন এবং কীভাবে লাভে পরিণত হবে?
যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার খরচ কমানো না যায় এবং আয় সেই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে এই ব্যবসায়িক ব্যবস্থা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো জ্বালানি ও অবকাঠামোর ওপর চাপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধুমাত্র একটি সফটওয়্যার নয়; এর পেছনে রয়েছে বিশাল শিল্প অবকাঠামো। তথ্যকেন্দ্র চালাতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে, যার অন্যতম প্রধান কারণ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে? নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ পরিবহন লাইন, উপকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হবে দীর্ঘ সময় ও বড় বিনিয়োগ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র ও সার্ভার থেকে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী শীতলীকরণ ব্যবস্থা। অনেক তথ্যকেন্দ্রে যন্ত্র ঠান্ডা রাখতে ব্যবহার করা হয় বিপুল পরিমাণ পানি। যদিও পানির ব্যবহার নির্ভর করে প্রযুক্তি, স্থান এবং ব্যবস্থাপনার ওপর, তবুও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের কারণে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পানির সংকট বা বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত, সেখানে এই প্রযুক্তি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে আসলে লাভবান হচ্ছে কারা?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান, চিপ নির্মাতা, মেঘভিত্তিক কম্পিউটার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ সরবরাহকারীসহ সবাই এই নতুন অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এনভিডিয়ার মতো কয়েকটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কারণ শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য বিশেষ ধরনের চিপ প্রয়োজন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লবে শুধু সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান নয়, হার্ডওয়্যার ও অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় সুবিধা পাচ্ছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো – কে আগে এগিয়ে যাবে, সেই প্রতিযোগিতা?
যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত শক্তি হতে পারে। তাই কেউ সহজে বিনিয়োগ কমাতে চাইছে না। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান বা দেশ যদি ধীরে এগোয় এবং অন্য কেউ দ্রুত উন্নতি করে, তাহলে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই প্রতিযোগিতা একদিকে নতুন আবিষ্কারকে উৎসাহ দিচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল অর্থ ও সম্পদের ব্যবহারও বাড়াচ্ছে।
চীনের ডিপসিকের মতো নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো আরেকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে- এই প্রযুক্তি উন্নয়নে কি সবসময় শত শত কোটি ডলার ব্যয় করতেই হবে? নাকি আরও দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম খরচে একই ধরনের সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব? এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ শুধু বেশি অর্থ বিনিয়োগের ওপর নয়, বরং দক্ষতা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ওপরও নির্ভর করবে।
এখানে আরেকটি অর্থনৈতিক বিষয় হলো জেভন্সের বৈপরীত্য। ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো প্রযুক্তি যত বেশি দক্ষ ও সস্তা হয়, তার ব্যবহার অনেক সময় তত বেড়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের খরচ কমে যায়, তাহলে আরও বেশি মানুষ ও প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করবে। সেক্ষেত্রে ব্যবহারের ফলে খরচ কমলেও মোট বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর চাহিদা কমার সম্ভবনা কম।
বিল দেয় কে?
আপনি যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন, তখন বিল দেয় কে? উত্তর হলো, এই বিল কোনো একক ব্যক্তি দেয় না। এর পেছনে রয়েছে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মেঘভিত্তিক কম্পিউটার সেবা প্রদানকারী, চিপ নির্মাতা, বিপুল পরিমাণ পানি এবং বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো ব্যবস্থা সবাই যুক্ত। কিন্তু এই ব্যয়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এই অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আর এই প্রযুক্তি মানবজাতি ও পরিবেশের জন্য কতটা হুমকি?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেছনে যত বেশি শক্তিশালী যন্ত্র, তথ্যকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ প্রয়োজন হচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে, তাহলে কার্বন নিঃসরণ, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু সংকট আরও জটিল হতে পারে। অর্থাৎ একটি ডিজিটাল উত্তর পাওয়ার পেছনে যে অদৃশ্য শক্তি খরচ হচ্ছে, তার পরিবেশগত মূল্যও মানবজাতিকে বহন করতে হবে।
আরও বড় উদ্বেগ হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই দ্রুত বিস্তার যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, পানি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়বে। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে যেখানে মানুষ এখনো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে, সেখানে বিশাল প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর জন্য বিপুল সম্পদ ব্যবহার নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তির অগ্রগতি আরও দ্রুত ও শক্তিশালী যন্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় মানবজাতির চাকরির বাজার, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
তাই এই প্রযুক্তি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই মানবজাতিকে সম্ভাব্য সংকট থেকে রক্ষা এবং পৃথিবীর সীমিত সম্পদ সংরক্ষণে এর ব্যবহার দায়িত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

