ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধে এমন একটি শব্দ সামনে এসেছে, যার প্রভাব হয়তো এখনই বোঝা যাবে না, কিন্তু ভবিষ্যতে দুই দেশের সীমান্তনীতির বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। শব্দটি হলো, ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’, সহজ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, পুরো সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত সমাধানের অপেক্ষা না করে সীমান্ত নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় যেসব ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব, সেগুলো আগে এগিয়ে নেওয়া।
২৫ আগস্ট বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের মধ্যে ২৫তম দফার বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকের পর এই শব্দবন্ধই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। পরদিন প্রকাশিত চীনের আট দফা সমঝোতায় বলা হয়েছে, সীমান্ত নির্ধারণ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মগোষ্ঠী ‘Early and Substantial Harvest’ এগিয়ে নেওয়ার কাজ করবে। একই সঙ্গে ২০০৫ সালের সীমান্ত-সমাধানের নীতিমালার ভিত্তিতে ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, ভারত কি শেষ পর্যন্ত চীনের সেই ধাপে ধাপে সীমান্ত সমাধানের ধারণার দিকে এগোচ্ছে?
এখনই এর উত্তর ‘হ্যাঁ’ বলা যাবে না। কারণ বৈঠকে ভারত তার কোনো ভূখণ্ডের দাবি প্রত্যাহার করেছে বা চীনের কোনো নির্দিষ্ট দাবি মেনে নিয়েছে- এমন তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। বরং দুই দেশই সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দুই পক্ষ প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিরোধপূর্ণ সীমান্ত নিয়ে ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানের আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে।
তবে পরিবর্তনটা অন্য জায়গায়।
এতদিন সীমান্ত বিরোধের আলোচনায় বড় প্রশ্ন ছিল- পুরো সীমান্তের চূড়ান্ত সমাধান কি একসঙ্গে করতে হবে, নাকি যেসব এলাকায় সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেগুলো আগে নিষ্পত্তি করা যাবে? এবার দুই দেশের সমঝোতায় দ্বিতীয় পদ্ধতির মতো একটি কাঠামো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এর অর্থ এই নয় যে ভারত চীনের কাছে সীমান্ত ছেড়ে দিচ্ছে। বরং এর অর্থ হতে পারে, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং বহু দশকের পুরোনো একটি বিরোধকে একবারে সমাধান করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে এগোনোর বাস্তবতা দুই দেশই মেনে নিতে শুরু করেছে।
এটি ভারতের জন্যও একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন হতে পারে।
কারণ সীমান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি বরাবরই চূড়ান্ত সমাধানকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দেখেছে। ২০০৫ সালের ‘Political Parameters and Guiding Principles’ চুক্তিও সীমান্ত সমস্যার সামগ্রিক কাঠামোগত সমাধানের ভিত্তি তৈরি করেছিল। এবার চীনের প্রকাশিত আট দফা সমঝোতায় সেই ২০০৫ সালের কাঠামোকে আবারও ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কোনো সীমান্ত চুক্তি দিয়ে পুরোনো কাঠামো সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না; বরং পুরোনো কাঠামোর ভেতরেই নতুন করে বাস্তব অগ্রগতির পথ খোঁজা হচ্ছে।
তাহলে চীনের লাভ কোথায়?
চীনের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সীমান্ত বিরোধকে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা থেকে বের করে আনা। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্ক যে গভীর সংকটে পড়েছিল, তার মূল কেন্দ্র ছিল সীমান্ত। কয়েক বছর ধরে সামরিক উত্তেজনা, সেনা মোতায়েন, টহল এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস দুই দেশের সম্পর্ককে প্রায় জিম্মি করে রেখেছিল।
২০২৪ সালের অক্টোবরে পূর্ব লাদাখে সেনা প্রত্যাহার ও টহলসংক্রান্ত সমঝোতার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। এরপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও দেখা যায়। রয়টার্সের হিসাবে, গত বছর নরেন্দ্র মোদির চীন সফরও ছিল সাত বছরের মধ্যে প্রথম। অর্থাৎ সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা কমার পর এখন দুই দেশ সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত পর্যায়ে ফেরানোর চেষ্টা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে সীমান্ত নির্ধারণে কিছুটা অগ্রগতি চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমান্ত শান্ত হলে বাণিজ্য, কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত করার সুযোগ বাড়ে।
ভারতেরও হিসাব আলাদা নয়।
চীন ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি হলেও একই সঙ্গে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পদের ওপর চাপ তৈরি করে। ফলে সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
সীমান্তে ‘দ্রুত অগ্রগতি’ যদি শেষ পর্যন্ত এমন একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, যেখানে আগে যেসব অঞ্চল নিয়ে তুলনামূলক কম বিরোধ রয়েছে সেগুলো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে, তাহলে ভবিষ্যতে সবচেয়ে কঠিন অঞ্চলগুলো নিয়ে দর-কষাকষির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
এটিই সম্ভবত ভারতের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়।
কারণ সীমান্তের সব অংশের কৌশলগত গুরুত্ব এক নয়। পশ্চিমে লাদাখ, মধ্যাঞ্চলে উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল এবং পূর্বে সিকিম ও অরুণাচল- প্রতিটি অঞ্চলের ভূগোল, সামরিক গুরুত্ব এবং দুই দেশের দাবির চরিত্র আলাদা। ফলে একটি অংশে সমঝোতা অন্য অংশের আলোচনায় রাজনৈতিক বা কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।
আর চীনের দীর্ঘদিনের কৌশলও ছিল- যেসব জায়গায় তুলনামূলকভাবে দ্রুত সমঝোতা সম্ভব, সেখানে আগে অগ্রগতি ঘটানো। এখন যদি ভারতও ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’ কাঠামোতে কাজ করতে সম্মত হয়, তাহলে বলা যায়, অন্তত পদ্ধতিগত পর্যায়ে দুই দেশের অবস্থান কিছুটা কাছাকাছি এসেছে।
তবে এটিকে চীনের কাছে ভারতের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখাও ভুল হবে।
কারণ একই আট দফা সমঝোতায় ২০০৫ সালের নীতিমালা অনুসরণ করে একটি ‘ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য’ চূড়ান্ত সমাধানের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভারত তার পুরোনো অবস্থান পুরোপুরি বাদ দিয়েছে- এমন প্রমাণ নেই। বরং নয়াদিল্লি সম্ভবত এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে, যেখানে সীমান্তে বাস্তব অগ্রগতি হবে কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের দাবি দুর্বল হবে না।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- শুধু সীমান্তের রেখা নয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও এবার আলোচনার বড় অংশ।
দুই দেশ পূর্ব ও মধ্য সেক্টরে আরও দুটি সামরিক হটলাইন এবং কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকের জন্য দুটি নতুন যোগাযোগ পয়েন্ট স্থাপনে সম্মত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সীমান্তে কোনো ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সামাল দেওয়া এবং ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাব থেকে নতুন সংঘাত ঠেকানো।
অর্থাৎ এবার আলোচনা শুধু ‘সীমান্ত কোথায় হবে’- এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। একই সঙ্গে ‘সীমান্তে উত্তেজনা হলে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে’- সেটিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এটি ২০২০ সালের অভিজ্ঞতার পর বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ ভারত ও চীন উভয়েই এখন বুঝতে পারছে, সীমান্তে ছোট একটি সংঘর্ষও মুহূর্তে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বহু বছর পিছিয়ে দিতে পারে। তাই সীমান্ত চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত না হলেও সংঘাত ব্যবস্থাপনার কাঠামো শক্তিশালী করা দুই দেশের জন্যই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির হিসাব।
ভারত ও চীন দুটিই বড় অর্থনীতি এবং উভয় দেশই নিজেদের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে। একই সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা তীব্র। এই পরিস্থিতিতে দিল্লি ও বেইজিং যদি নিজেদের দ্বিপক্ষীয় বিরোধ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তাহলে দুই দেশেরই কৌশলগত সুবিধা রয়েছে।
সেপ্টেম্বরে ভারতে ব্রিকস সম্মেলন হওয়ার কথা। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফর নিয়েও আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে দোভাল-ওয়াং বৈঠককে কেবল সীমান্ত বৈঠক হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বৃহত্তর প্রক্রিয়ায় এই বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তবে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফর বা ব্রিকস সম্মেলনের কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরির জন্য ভারত সীমান্তে বড় কোনো ছাড় দিচ্ছে- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ারও এখনই সুযোগ নেই।
বরং উল্টোভাবে দেখলে, ভারত হয়তো চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে সীমান্তে একটি ব্যবস্থাপনাযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে চাইছে। অর্থাৎ ‘সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, কিন্তু সীমান্তে স্থিতিশীলতা থাকতে হবে’- এই নীতিতে এগোচ্ছে নয়াদিল্লি।
চীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তববাদ দেখা যাচ্ছে। ওয়াং ই বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, এর বৈশ্বিক ও কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে। তিনি দুই দেশকে যোগাযোগ বাড়িয়ে পার্থক্য কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে আসল পরীক্ষা হবে কাগজের সমঝোতার পর বাস্তব মাটিতে।
কারণ সীমান্তের মানচিত্রে একটি রেখা টানা যতটা সহজ বলে মনে হয়, বাস্তবে হিমালয়ের দুর্গম ভূখণ্ডে সেই রেখা নির্ধারণ ততটাই জটিল। কোথায় টহল হবে, কোন উচ্চভূমির নিয়ন্ত্রণ কার থাকবে, কোন পথ বা উপত্যকা কার প্রশাসনিক সীমার মধ্যে পড়বে- এসব প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন দর-কষাকষির জায়গা তৈরি করবে।
এ কারণে ‘আর্লি হার্ভেস্ট’ শব্দটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে- কোন কোন এলাকায় এই অগ্রগতি হচ্ছে এবং সেই অগ্রগতির বিনিময়ে ভারত বা চীন কী ছাড় দিচ্ছে।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার- ভারত চীনের সব দাবি মেনে নিয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট যে দুই দেশ সীমান্ত বিরোধকে শুধু সামরিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে না দেখে ধীরে ধীরে সীমান্ত নির্ধারণের বাস্তব আলোচনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ২৫ আগস্টের বৈঠকে সীমান্ত নির্ধারণের অগ্রগতি এবং ২০০৫ সালের কাঠামোর ভিত্তিতে চূড়ান্ত সমাধানের আলোচনা- দুই বিষয়ই একসঙ্গে এসেছে।
ভারত কি চীনের চাপ মেনে নিচ্ছে?
তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু সরল নয়।
বরং আসল প্রশ্ন হলো, ভারত কি চীনের প্রস্তাব পুরোপুরি গ্রহণ না করেও সেই প্রস্তাবের পদ্ধতিকে ব্যবহার করে নিজের কৌশলগত স্বার্থে সীমান্ত সমস্যাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে চাইছে?
যদি সেটিই হয়, তাহলে ২০২৬ সালের এই উদ্যোগ ভারত-চীন সীমান্তনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।
আর যদি আগামী মাসগুলোতে দেখা যায়, ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’ বাস্তবে নির্দিষ্ট সীমান্ত এলাকার অবস্থান বদলে দিচ্ছে, তখনই বোঝা যাবে- এটি নিছক কূটনৈতিক ভাষা ছিল, নাকি কয়েক দশকের সীমান্ত বিরোধ মেটাতে ভারত সত্যিই নতুন খেলায় নামছে।
এই কারণেই এখন সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে তিনটি বিষয়ের ওপর- কোন অঞ্চল আগে নির্ধারিত হয়, ভারত-চীন কোন মানচিত্র বা সীমারেখা নিয়ে একমত হয় এবং সেই সমঝোতায় কে কতটা কৌশলগত সুবিধা নেয়।

