দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা দুই রিপাবলিকান প্রার্থী। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান থেকে নিজেদের কিছুটা দূরে সরিয়ে নেওয়ার এই পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা।
আইওয়ায় ডেমোক্র্যাট জশ তুরেকের বিপরীতে লড়ছেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি অ্যাশলি হিনসন। মিশিগানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট ড. আবদুল এল-সায়েদের বিপরীতে রয়েছেন সাবেক প্রতিনিধি মাইক রজার্স। সোমবার দুজনই ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে সরে এসে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান।
বিশেষ করে হিনসনের অবস্থান পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। গত সপ্তাহের ভোটসহ এ ধরনের ছয়টি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন হিনসন। তবে সোমবার তিনি ইরানে যুদ্ধের অবসান চাওয়া রিপাবলিকানদের অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হন।
জ্বালানির দাম নিয়ে বাড়ছে চাপ
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ফেব্রুয়ারি থেকে জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও পরিবহন খাতে ডিজেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল আইওয়ার মতো রাজ্যগুলোতে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাসোলিনের ওপর কর স্থগিত করা, ডিজেল রপ্তানিতে সাময়িক বিরতি এবং ইরান যুদ্ধের ‘সফল ও তাৎক্ষণিক সমাপ্তি’র পক্ষে অবস্থান জানান। তার বক্তব্য ছিল, যুদ্ধের ব্যয় যেন আইওয়ার মানুষের জ্বালানি ও বাজার খরচের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
অন্যদিকে রজার্স একটি মুদি দোকানে ধারণ করা প্রচারণামূলক ভিডিওতে বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি গ্যাসোলিনের ওপর অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর স্থগিত এবং সাময়িকভাবে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের প্রস্তাব দেন।
ট্রাম্প অবশ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে—এমন আশঙ্কা নাকচ করে আসছেন। তার বক্তব্য, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দামও কমে আসবে।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও ভিন্ন সুর
হিনসন ও রজার্সের অবস্থান পরিবর্তন রিপাবলিকান দলের কয়েকজন প্রার্থীর মধ্যে ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের মধ্যে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, তা নিয়ে দলটির প্রার্থীদের কেউ কেউ এখন নিজেদের অবস্থান আলাদা করে তুলে ধরছেন।
সম্প্রতি আইওয়ার দুই রিপাবলিকান প্রতিনিধি জ্যাক নান ও মারিয়্যানেট মিলার-মিকসও ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর আগে তারা এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন।
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রিপাবলিকানদের আরও কয়েকজন নেতা বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলেছেন। আইওয়ার সিনেটর চার্লস গ্রাসলি ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুনে এমন পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করার কথা বলেছেন। ওহাইওর রিপাবলিকান নেতা বিবেক রামাস্বামীও গ্যাসোলিন কর স্থগিতের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের নীতি থেকে দূরত্বের আরও উদাহরণ
ইরান যুদ্ধের বাইরেও কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতির সঙ্গে নিজেদের অবস্থানের পার্থক্য তুলে ধরছেন।
রজার্স গত মাসে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে এক বছরের স্থগিতাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের সম্প্রসারণে জোরালো সমর্থন দিয়ে আসছেন।
হিনসনও সম্প্রতি ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সঙ্গে প্রকাশ্য কর্মসূচিতে কিছুটা দূরত্ব রেখেছেন। চলতি মাসে ডালাসে অনুষ্ঠিত ট্রাম্পের মধ্যবর্তী মেয়াদের সম্মেলনে তিনি অংশ নেননি। শুক্রবার আইওয়ার কাউন্সিল ব্লাফসে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে নির্ধারিত একটি সমাবেশেও তিনি উপস্থিত হননি। তার প্রচারশিবির অবশ্য জানিয়েছে, আগে থেকে নির্ধারিত কর্মসূচির কারণেই তিনি ওই অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি।
মঙ্গলবার উটাহর রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটিকে ডনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের বিরুদ্ধে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। আর্থিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্ক ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের তদন্তের দাবি করেছিলেন কার্টিস।
ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা সমালোচনা
রিপাবলিকান প্রার্থীদের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তনকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন ডেমোক্র্যাটরা। এল-সায়েদ অভিযোগ করেছেন, রজার্স এখন ইরান যুদ্ধের বিষয়ে অবস্থান বদলাচ্ছেন। অন্যদিকে আইওয়ার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জশ তুরেক হিনসনকে উদ্দেশ করে বলেছেন, যুদ্ধের বাড়তি ব্যয় মোকাবিলায় যে প্রস্তাবগুলো তিনি এখন সমর্থন করছেন, সেগুলো তুরেক আগেই দিয়েছিলেন।
হিনসন অবশ্য এর আগে ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে একাধিকবার ভোট দিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদে এ ধরনের তিনটি প্রস্তাব পাস হলেও এখন পর্যন্ত কংগ্রেসের উভয় কক্ষে মাত্র একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। ফলে এখন পর্যন্ত এগুলোর কারণে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিতে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়টিও সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর ফলে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কেউ কেউ ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে নিজেদের অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট করে তুলে ধরছেন।
মিশিগানের রজার্সের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ নিয়ে সাম্প্রতিক মতপরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক চলছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ব্রিজ মিশিগানও তার ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠতা এবং ইরান যুদ্ধের বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনকে নির্বাচনী প্রচারের আলোচ্য বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

