বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতা নতুন কোনো বিষয় নয়। সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আঞ্চলিক আধিপত্য সহ বিভিন্ন বাস্তব কারণেই ভারতের নীতি ও ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা কি অজান্তেই এমন এক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছি, যেখানে পাকিস্তানের অতীতও নতুন করে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে?
এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।
ভারতকে প্রশ্ন করা এক বিষয়, পাকিস্তানকে পুনর্বাসন আরেক
বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব যেমন হতে পারে, তেমনি স্বার্থের সংঘাতও হতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে ভারতের সমালোচনা করা দেশপ্রেমবিরোধী নয়; বরং সেটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অধিকার।
কিন্তু ভারতবিরোধিতার রাজনৈতিক আবেগ যদি এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈষম্য, বাঙালির ভাষার অধিকার হরণ কিংবা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে আড়াল করা শুরু হয়, তখন বিষয়টি আর নিছক ভারতবিরোধিতা থাকে না।
কারণ বাংলাদেশের জন্ম কোনো ভূরাজনৈতিক দুর্ঘটনা ছিল না। বাঙালির দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ—এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্ম।
সুতরাং ভারতকে সমালোচনা করতে গিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অতীতকে রোমান্টিক করে তোলা বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাসের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
ইতিহাসকে নতুন করে পড়া দরকার, কিন্তু মুছে ফেলার জন্য নয়
একটি জাতির ইতিহাস কখনোই স্থির কোনো পাথরের ফলক নয়। সময়ের সঙ্গে ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে নতুন গবেষণা, নতুন প্রশ্ন এবং নতুন ব্যাখ্যা আসতেই পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা কিংবা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি; সবকিছু নিয়েই সমালোচনা, গবেষণা ও বিতর্কের সুযোগ থাকা উচিত।
কিন্তু ইতিহাস পুনঃপাঠ আর ইতিহাস পুনর্লিখন এক জিনিস নয়।
কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির বিতর্কিত ভূমিকা থাকলে সেটিও ইতিহাসে থাকবে। কিন্তু তার রাজনৈতিক অবস্থানকে গৌরবান্বিত করা এবং তার ঐতিহাসিক ভূমিকা ব্যাখ্যা করা; দুটিকে এক করে ফেললে ইতিহাস আর নির্মোহ থাকে না।
একইভাবে কোনো নেতার রাজনৈতিক ভুল বা অপরাধ থাকলে তার কারণে তার সব ঐতিহাসিক অবদান মুছে ফেলা যেমন অনুচিত, তেমনি অবদানের কারণে তার ভুল ও দায় আড়াল করাও অনৈতিক।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এখানে কাউকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই, আবার কাউকে দানব বানিয়েও সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
ডাকসু বা কোনো সংগ্রহশালা রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র হওয়া উচিত নয়
ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা মূলত স্মৃতি সংরক্ষণের জায়গা। সেখানে কে ছিলেন, কী করেছিলেন, কোন সময়ে কী অবস্থান নিয়েছিলেন সবকিছুই প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি সেখানে থাকতেই পারে। কিন্তু তার সঙ্গে অবশ্যই থাকতে হবে যথাযথ সময়, ঘটনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
জিন্নাহ যদি সেখানে থাকেন, তবে ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার অবস্থানও থাকতে হবে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর বৈষম্যের ইতিহাস থাকতে হবে। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতাও থাকতে হবে। একইভাবে বঙ্গবন্ধু থাকলে তার রাজনৈতিক অবদান যেমন থাকবে, তেমনি তার শাসনামলের বিতর্ক ও ব্যর্থতা নিয়েও গবেষণাভিত্তিক তথ্য থাকতে পারে।
কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন ইতিহাসের একটি অংশকে সামনে আনার জন্য অন্য অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়।
একটি সংগ্রহশালা তখন আর ইতিহাসের জায়গা থাকে না; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।
১৯৭১-কে অস্বীকার করে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে নানা দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, ভূগোল, অর্থনীতি সবই এর অংশ।
কিন্তু ১৯৭১ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তি। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের নতুন কোনো জাতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করলে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়বেই।
একই সঙ্গে ১৯৭১-এর নাম ব্যবহার করে গত দেড় দশকের সব রাজনৈতিক অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য নয়।
এখানেই প্রয়োজন ইতিহাস ও রাজনীতিকে আলাদা করে দেখার সক্ষমতা।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। আবার শেখ হাসিনার শাসনামলের রাজনৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবস্থানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির উত্তরাধিকার আর একটি রাজনৈতিক সরকারের জবাবদিহি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
আজ বাংলাদেশের সামনে মূল জিজ্ঞাসা ‘ভারত না পাকিস্তান’ এটি নয়।
মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি নিজের স্বার্থে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারবে?
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বাংলাদেশের স্বার্থে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও হবে বাংলাদেশের স্বার্থে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, রাশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক – সব ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ কোনো দেশের ছায়া রাষ্ট্র নয়। কোনো দেশের বিরোধিতা করতে গিয়ে অন্য দেশের রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বয়ানের অনুসারী হওয়ারও প্রয়োজন নেই।
আমাদের জাতীয়তাবাদ যদি সত্যিই স্বাধীনচেতা হয়, তাহলে তার প্রথম শর্ত হবে—বাংলাদেশের স্বার্থকে দিল্লি, ইসলামাবাদ কিংবা অন্য কোনো রাজধানীর রাজনৈতিক হিসাবের নিচে না রাখা।
ভারতবিরোধিতার বাজারে পাকিস্তান কেন ফিরে আসবে?
এখানেই সবচেয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন।
ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভের রাজনৈতিক বাজার তৈরি হলে সেখানে পাকিস্তানকে বিকল্প হিসেবে হাজির করার চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের কাছে পাকিস্তান কেবল একটি বিদেশি রাষ্ট্র নয়; ১৯৭১-এর স্মৃতি এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ইতিহাসের সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে।
তাই ভারতকে ঘৃণা করতে শেখানোর সঙ্গে পাকিস্তানকে ভালোবাসতে শেখানো এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনা যদি সত্যিই স্বাধীন হয়, তাহলে তার অবস্থান হবে আরও পরিষ্কার—
– ভারতের অন্যায় নীতির প্রতিবাদ করব, কিন্তু পাকিস্তানের অন্যায় ইতিহাসও ভুলব না।
– ভারতের আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করব, কিন্তু অন্য কোনো দেশের আধিপত্যও গ্রহণ করব না।
– ১৯৭১-এর ইতিহাস ধারণ করব, কিন্তু ইতিহাসকে কোনো দলের রাজনৈতিক লাইসেন্স হিসেবেও ব্যবহার করতে দেব না।
এটাই হতে পারে একটি পরিণত জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।
ইতিহাসের মালিক কেউ নয়
বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। ভাষা আন্দোলন কোনো সংগঠনের একার অর্জন নয়। আবার দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইচ্ছেমতো মুছে ফেলাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়।
ইতিহাসের মালিক জনগণ।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সত্যকে যতটা সম্ভব পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরা।
তাই আজ প্রয়োজন ইতিহাসের নতুন কোনো দেবতা তৈরি করা নয়; প্রয়োজন ইতিহাসের সব দরজা খুলে দেওয়া।
– জিন্নাহ থাকবেন, কিন্তু তার বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানও থাকবে।
– বঙ্গবন্ধু থাকবেন, তার ঐতিহাসিক অবদান যেমন থাকবে, তেমনি তার রাজনৈতিক সময়ের বিতর্কও থাকবে।
– ১৯৭১ থাকবে তার সঙ্গে থাকবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালির অধিকারবঞ্চনার পূর্ণ ইতিহাস।
– জুলাইয়ের আন্দোলন থাকবে—কিন্তু তার ব্যাখ্যাও হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
কারণ ইতিহাসকে এক পক্ষের হাত থেকে নিয়ে অন্য পক্ষের হাতে তুলে দেওয়া কোনো মুক্তি নয়।
বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন রাখতে হলে প্রথমে তার ইতিহাসকে রাজনৈতিক দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে।
আর সেই মুক্ত ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত একটাই—
বাংলাদেশ কারও ভারতবিরোধী প্রকল্প নয়, কারও পাকিস্তানপন্থী প্রকল্পও নয়। বাংলাদেশ বাংলাদেশেরই।

