চলতি মাস থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কাঠামোর বেতন-ভাতা হাতে পেতে শুরু করছেন। তবে এই বাড়তি অর্থ এবার আয়কর রিটার্নে দেখাতে হবে না। রিটার্নে গত অর্থবছরের প্রকৃত আয়ের হিসাব দিতে হবে। করযোগ্য আয়ও সীমিত। আয়কর আইনে সরকারি চাকরিজীবীদের মাত্র তিন ধরনের আয়ের ওপর কর বসে। ৪২ ধরনের ভাতা ও সুবিধা পুরোপুরি করমুক্ত।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বছর সারা বছর ধরে রিটার্ন জমা নেওয়ার সুযোগ রেখেছে। ফলে করদাতারা নিজেদের সুবিধামতো সময়ে রিটার্ন দিতে পারবেন। তবে কোন সময়ের আয় দেখাতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। বিশেষ করে নতুন বেতন কার্যকর হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, বাড়তি টাকা এবারই রিটার্নে যুক্ত হবে কি না। এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী উত্তর হলো, না।
এবারের রিটার্নে হিসাব দিতে হবে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের আয়ের। নতুন বেতন-ভাতা কার্যকর হয়েছে জুলাই থেকে, অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে। তাই সেই আয় যুক্ত হবে আগামী বছরের রিটার্নে। এবার কর দিতে হবে শুধু আগের অর্থবছরে পাওয়া আয়ের ওপর।
দেশে বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এঁদের একটি অংশ এখনো করজালের বাইরে রয়ে গেছে। অথচ আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আয়ের ওপর কর দেওয়া সবার জন্যই বাধ্যতামূলক। রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা অবশ্য পদমর্যাদার ওপর নির্ভর করে। দশম গ্রেড বা তার ওপরের পদের কর্মকর্তাদের রিটার্ন দিতেই হবে। এর নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এই বাধ্যবাধকতা নেই। বাধ্যতামূলক হলেও যাঁরা রিটার্ন জমা দেবেন না, তাঁদের বেতন-ভাতা পেতে জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের সব আয়ের ওপর কর বসে না। কিছু খাতে আইনেই ছাড় দেওয়া আছে। ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই জারি করা আয়কর প্রজ্ঞাপন (২২৫ নম্বর) অনুসারে তিনটি আয় করযোগ্য। সেগুলো হলো মূল বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাস। এই তিন খাতের মোট অঙ্কের ওপর প্রযোজ্য হারে আয়কর দিতে হবে।
অন্যদিকে এনবিআরের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আয়কর নির্দেশিকায় মোট ৪২ ধরনের ভাতা ও সুবিধাকে করের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আছে চিকিৎসা ভাতা, নববর্ষ ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা, শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, পাহাড়ি ভাতা, ভ্রমণ ভাতা, যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, পোশাক ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা ও ধোলাই ভাতা। আরও আছে বিশেষ ভাতা, প্রেষণ ভাতা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা, জুডিশিয়াল ভাতা, চৌকি ভাতা, ডোমেস্টিক এইড অ্যালাউয়েন্স, ঝুঁকি ভাতা, অ্যাকটিং অ্যালাউন্স, মোটরসাইকেল ভাতা, আর্মরার অ্যালাউন্স, নিঃশর্ত যাতায়াত ভাতা ও টেলিকম অ্যালাউন্স।
তালিকায় আরও রয়েছে ক্লিনার অ্যালাউন্স, ড্রাইভার অ্যালাউন্স, মাউন্টেড পুলিশ অ্যালাউন্স, পিবিএক্স অ্যালাউন্স, সশস্ত্র শাখা ভাতা, বিউগলার অ্যালাউন্স, নার্সিং অ্যালাউন্স, দৈনিক বা খোরাকি ভাতা, ট্রাফিক অ্যালাউন্স ও রেশন মানি। এ ছাড়া আছে সীমান্ত ভাতা, ব্যাটম্যান ভাতা, ইন্সট্রাকশনাল অ্যালাউন্স, নিযুক্তি ভাতা, আউটফিট ভাতা এবং গার্ড পুলিশ ভাতা।
তবে এই তালিকা দেখে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই যে প্রত্যেক সরকারি চাকরিজীবীই এতগুলো ভাতা পান। কোন ভাতা কে পাবেন, তা নির্ভর করে চাকরির ধরন ও দায়িত্বের প্রকৃতির ওপর। যেমন সশস্ত্র শাখা, পুলিশ, চিকিৎসা বা বিচার বিভাগের কর্মীদের জন্য আলাদা কিছু ভাতা নির্ধারিত আছে। সাধারণ প্রশাসনিক পদে কর্মরতরা পান তুলনামূলক কম ভাতা।
এই কর কাঠামো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। সরকারি চাকরিজীবীদের মোট প্রাপ্তির বড় একটি অংশ ভাতা হিসেবে আসে, আর সেই ভাতার বেশির ভাগই করমুক্ত। ফলে আয়কর হিসাব হয় মূলত মূল বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাসের ভিত্তিতে। এতে করের চাপ তুলনামূলক কমে। একই সঙ্গে রিটার্ন তৈরির সময় কোন আয় করযোগ্য আর কোনটি নয়, তা আলাদা করে চিনে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। ভুল হিসাব দিলে অযথা বাড়তি কর দেওয়ার ঝুঁকি থাকে, আবার করযোগ্য আয় বাদ পড়লে আইনি জটিলতারও আশঙ্কা তৈরি হয়।
নতুন বেতন-ভাতা কার্যকর হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ছে। ফলে আগামী বছরের রিটার্নে করযোগ্য আয়ের অঙ্কও বাড়তে পারে। এখন থেকেই নিয়মকানুন জেনে রাখলে রিটার্ন দেওয়ার সময় সুবিধা হবে। করজালের বাইরে থাকা কর্মকর্তাদেরও আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হয়ে রিটার্ন দেওয়ার তাগিদ রয়েছে।

