গতকাল (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা কে কেন্দ্র করে রাজশাহী রেল স্টেশনে ভাংচুর চালায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। এতে, প্রচুর সরকারী সম্পদ ও অর্থের ক্ষতি হয়। এর বাইরে সাধারন যাত্রীদের হয়রানি আর ভীতির কারন হয়ে দাঁড়ায় এই উগ্র তৎপরতা। ঠিক এই কারনে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী রাতের ট্রেন ধুমকেতু এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশ্যে যেতে পারেনি।
এখন প্রশ্ন- একজন সাধারণ মানুষ থানায় আগুন দিলে কী হয়? তাকে অপরাধী বলা হয়। পুলিশ মামলা করে। আদালতে বিচার হয়। এবার একই কাজ যদি একজন ছাত্র করে, তাহলে কী হয়? ভাষা বদলে যায়। তখন এটা হয়ে যায় “ছাত্রদের ক্ষোভ” বা “আন্দোলনের বাড়াবাড়ি”। প্রশ্ন হলো, ছাত্রদের ক্ষোভ কি বাংলাদেশের আইনের বাইরে কোনো প্রতিক্রিয়া? তারা কি সংবিধানের উর্ধে? তাদের উপর কি কি দণ্ডবিধি চলে না?
অতীতের কিছু ঘটনা
গত দুই বছরে অনেক ক্যাম্পাসে সহিংসতা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সংঘর্ষে হল ভাঙচুর হয়। প্রশাসন ৪২ জন ছাত্রকে শোকজ করে। শুধু একটা চিঠি দেয়, মামলা করে না, গ্রেপ্তার করে না। ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের সংঘর্ষে দুই কলেজের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি কবি নজরুল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও একটি মেডিকেল কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। ভোলায় পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্ন কঠিন হয়েছে বলে সরাসরি কেন্দ্রই ভাঙচুর হয়।
প্রতিবার একটাই প্রশ্ন থাকে। জনগণের টাকায় বানানো সম্পত্তি ভাঙার পর দায় নেয় কে? উত্তর প্রায় সবসময় এক। কেউ না। এখন সাধারন জনগন পর্যন্ত ছাত্রদের কর্মকান্ডকে ক্রিমিনাল লেন্সে দেখে না। ছাত্ররা অপরাধ করে উলটা গলাবাজী করে এইভাবে বছরের পর বছর পার পেয়ে যাওয়ায় তাদের সামষ্টিক মূল্যবোধ তলানীতে ঠেকেছে।
বাংলাদেশের আইন কী বলে
বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে এসবের জন্য স্পষ্ট শাস্তি আছে।
ধারা ১৪১ থেকে ১৪৩ বেআইনি জমায়েতের জন্য প্রযোজ্য। ধারা ১৪৬ থেকে ১৪৮ দাঙ্গার শাস্তি বলে দেয়। অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা করলে শাস্তি আরও বেশি হয়। ধারা ৪২৫ থেকে ৪২৭ সম্পত্তি নষ্ট করার শাস্তি ঠিক করে দেয়। ধারা ৪৩৫ ও ৪৩৬ আগুন দিয়ে সম্পত্তি পোড়ানোর শাস্তি বলে। আগুন লাগানো আইনের চোখে আরও বড় অপরাধ।
বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ এর ১৫ নম্বর ধারা আছে সরকারি সম্পত্তির জন্য। কেউ ইচ্ছা করে সরকারি ভবন, গাড়ি বা যন্ত্র নষ্ট করলে এই আইনে শাস্তি সাধারণ দণ্ডবিধির চেয়েও কঠোর।
এই আইনগুলোর কোথাও লেখা নেই যে ছাত্র হলে মাফ পাওয়া যায়। আইনের কাছে বয়স বা পরিচয় কোনো শর্ত না। কাজটা কী হয়েছে, সেটাই আসল কথা। তাহলে ক্যাম্পাসের ভাঙচুর বা ক্যাম্পাসের আশেপাশের এলাকায় ভাঙচুরে এই ধারাগুলো কেন প্রয়োগ হয় না? কেন বিশ্ব বিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে ছাত্রদের বিরুদ্ধে মামলা করে না?
কেন আজকের ছাত্ররা এমন হলো?
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই উশৃঙ্খলতার প্রধান কারন হলো বিশ্ব বিদ্যালয় প্রসাশনের আসকারা আর ছাত্রদের প্রতি নতজানু মনোভাব। তাদের পক্ষ থেকে কোন শক্ত পদক্ষেপ না থাকায় শিক্ষার্থীরা এসব ভাংচুর প্রতিনিয়ত করে যায়, কারন তারা জানে তাদের কিছু করার ক্ষমতা এই দেশে কারো নেয়। তাদের এই চিন্তা ধারায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গুলাকে এক প্রকার এক্সট্রা কন্সটিটিউশানাল জায়গা বানায় রেখেছে।
দ্বিতীয় কারণ রাজনীতি। বড় ছাত্র সংগঠনগুলো কোনো না কোনো দলের অংশ। ওসি জানেন, আজকের শোকজ পাওয়া ছাত্রনেতা কাল ক্ষমতায় বসতে পারে। তাই আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্ত হয় ঝুঁকি হিসাব করে, ন্যায়বিচার দেখে নয়।
তৃতীয় কারণ আবেগ। “ওরা তরুণ, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম” এই কথা বলে অপরাধ ঢেকে দেওয়া হয়। কিন্তু একই দেশে একজন ১৮ বছরের ছেলে চুরির দায়ে জেলে যায়।
চতুর্থ কারণ ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তর, নব্বই, ২০২৪ এর অভ্যুত্থান, প্রতিটির নিজস্ব গুরুত্ব আছে। কিন্তু সেই সম্মানের আড়ালে আজকের যেকোনো ভাঙচুরকে একই কাতারে ফেলা ঠিক না। একটা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঘটা ক্ষতি, আর সামান্য মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রেল স্টেশন ভাঙার মধ্যে অনেক তফাত। এই তফাত মুছে ফেলাই সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ।
আসল ক্ষতিগ্রস্ত কারা?
ভাঙা জানালা, পোড়া গাড়ি, নষ্ট হওয়া ল্যাবের যন্ত্র, এসবের টাকা আসে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে। মানে কৃষকের টাকা, রিকশাচালকের টাকা, শ্রমিকের টাকা। যে ছাত্র কাঁচ ভাঙে, তার দাম দেয় সেই গরিব বাবা মা, যাদের সন্তান হয়তো একই কলেজে ভর্তি হতে চায়। “ছাত্রদের ক্ষোভ” কথাটা যখন দায় এড়ানোর ঢাল হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় দুর্বল মানুষের। ক্ষতি হয় অসুস্থ বাবা মা নিয়ে ঢাকায় ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে যেতে চাওয়া ছেলেটার, কারন আজকে রাতে ট্রেন ছাড়বে না রাজশাহী থেকে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে একসময় ট্রাইবাল কালচার ছিলো, তেমন কোন কারন ছাড়াই প্রচুর মারামারি করতো। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার বিস্তারে এই কালচার অনেকটা বিলোপ হয়েছে। কিন্ত যখন বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত যুবকেরা হুতু তুতসিদের মত মারামারি করে তখন এই দেশের শিক্ষার মান, শিক্ষকের মান, আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
ছাত্রদের রাগ থাকতে পারে, থাকা উচিতও। খারাপ শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, নিয়োগ বাণিজ্য, আবাসন সংকট, এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু ন্যায্য রাগ কখনো বেআইনি কাজের ছাড়পত্র হতে পারে না। আইনের শাসন মানে একই কাজে একই শাস্তি, পরিচয় যাই হোক। যতদিন আমরা “ছাত্র” শব্দটাকে দণ্ডবিধি এড়ানোর চাবি বানিয়ে রাখব, ততদিন ক্যাম্পাস সহিংসতা কমবে না। ছাত্র কতৃক বেআইনি ধ্বংসযজ্ঞ সহিংসতা কমবে না। আর যেসব শিক্ষার্থী সত্যিকার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে, তারাও একই দুর্নাম বয়ে বেড়াবে।

