পুরান ঢাকার খুবই কমন ও প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য হলো, একটি পানির পাম্পের সামনে হাতে কলস, বোতল আর জার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নারী-পুরুষ, শিশু ও বয়স্করা। কারও কাজের তাড়া, কারও ঘরে রান্না অপেক্ষায়, কারও স্কুলের প্রস্তুতি বাকি। কিন্তু এসবের আগে নিশ্চিত করতে হচ্ছে দিনের সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজন, পানি।
আধুনিক নগরীতে নিরাপদ পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা শুধু দুর্ভোগ নয়। এটি নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতারও প্রতীক।
সংখ্যায় সংকট
●ঢাকার দৈনিক পানির চাহিদা বর্তমানে ২৯০ থেকে ৩০৫ কোটি লিটার, আর আনুমানিক প্রয়োজন ৩১০ কোটি লিটার। অর্থাৎ হিসাবের খাতায় ঘাটতি সামান্য, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সংকট তীব্র।
●রাজধানী এখনও পানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশের জন্য ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
●বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) তথ্যমতে ঢাকায় পানির স্তর ১৯৯৬ সালে ছিল ভূপৃষ্ঠের ২৫ মিটার নিচে, ২০০৫ সালে ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার এবং ২০২৩ সালে ৭৫ মিটার। স্তর নামছে বছরে সর্বোচ্চ প্রায় দুই মিটার হারে।
●ওয়াসার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী সিস্টেম লস ২০১০ সালে ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে কমে ২০ শতাংশে নেমেছে। তবে একটি ঋণপ্রকল্পের নথিতে অনুৎপাদক পানির (উৎপাদিত কিন্তু বিল না হওয়া পানি) হার ৩০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে, যার কারণ পাইপলাইনের লিকেজ, অবৈধ সংযোগ ও চুরি।
●ঢাকায় বছরে গড়ে প্রায় ২ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা লন্ডনের প্রায় তিন গুণ। তবু সেই পানি মাটির নিচে পৌঁছাচ্ছে না।
পাইপলাইন আছে, নিশ্চয়তা কোথায়?
ঘরে ঘরে পানির সংযোগ নিঃসন্দেহে অবকাঠামোগত অগ্রগতি। কিন্তু সরবরাহ অনিয়মিত হলে, পানি অপর্যাপ্ত হলে কিংবা ব্যবহারের অযোগ্য হলে সেই সংযোগের মূল্য কতটুকু?
পুরান ঢাকায় প্রশ্নটি শুধু পরিমাণের নয়, মানেরও। কলে আসা ওয়াসার পানি ময়লা ও দুর্গন্ধের কারণে পান করা যায় না, আর পুরোনো পাইপলাইন ফুটো হয়ে যাওয়ায় তাতে ময়লা ঢুকছে। ঢাকা ওয়াসা নিজেও নগরবাসীকে কলের পানি ফুটিয়ে পান করতে উৎসাহিত করে।
পানির সংকটে থমকে যায় পরিবারের দৈনন্দিন জীবন। সবচেয়ে বেশি ভোগেন নারী, শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থরা। পানি সংগ্রহে সময়, শ্রম ও অর্থ খরচ হয়, ব্যাহত হয় কাজ ও পড়াশোনা।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সংকট আরও কঠিন। সামর্থ্যবানরা বিকল্প উৎস থেকে পানি কিনতে পারেন, কিন্তু সীমিত আয়ের মানুষের কাছে সেই বাড়তি খরচই বড় বোঝা।
নগরায়ণ বেড়েছে, নাগরিক সেবা কি বেড়েছে?
পুরান ঢাকা ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঘনবসতির কেন্দ্র। জনসংখ্যা, আবাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাপ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও অন্যান্য সেবা কতটা উন্নত হয়েছে, এ প্রশ্ন এড়ানো যায় না। ঢাকা ওয়াসাকে এখন ৩৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২ কোটিরও বেশি মানুষকে সেবা দিতে হয়।
ভবন, সড়ক বা পাইপলাইন নির্মাণই উন্নয়নের চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। আসল সাফল্য নির্ভর করে মানুষ সেই অবকাঠামো থেকে কতটা কার্যকর সেবা পাচ্ছে তার ওপর।
সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। ওয়াসার কর্মকর্তারা কারিগরি ত্রুটি, পাম্পিং স্টেশনের মেরামত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা বাড়াকে দায়ী করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবই বারবার সংকটের মূল কারণ। প্রকৃত কারণ শনাক্ত না করে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়ানো বা ট্যাংকার পাঠানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
বর্তমান উদ্যোগেও পুরোনো পথের ছায়া দেখা যায়। ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার “জরুরি পানি সরবরাহ” প্রকল্পে ৩৮৮টি পুরোনো গভীর নলকূপ বদলে ও ৬২টি নতুন নলকূপ বসিয়ে আরও ৫৭ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর বদলে আরও নলকূপের ওপরই ভরসা করা হচ্ছে।
দায় এড়ানোর নয়, জবাবদিহির সময়
সংকট অস্বীকারের প্রবণতাও জবাবদিহির পথে বাধা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগ, লালবাগসহ পুরান ঢাকার কয়েকটি এলাকায় পানি সংকট দেখা দিলে ওয়াসা জানায়, রাজধানীর কোথাও সংকট নেই, কেবল সাময়িক এলাকাভিত্তিক সমস্যা আছে, যা ১০-১৫ দিনে মিটে যাবে। বাসিন্দারা তখন পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে।
ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয়:
●এলাকাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ ও সরবরাহের দুর্বলতা চিহ্নিত করা
●কোথায় কতক্ষণ পানি যাচ্ছে, কোথায় চাপ কম, কোথায় পাইপলাইনে ত্রুটি এবং অভিযোগে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা
●পানির গুণমান নিয়মিত পরীক্ষা করে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা
●জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা
●দীর্ঘমেয়াদে পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার, অপচয় ও অননুমোদিত সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং টেকসই উৎস গড়ে তোলা
●বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ও ভূগর্ভে পুনর্ভরণের ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে শহরের ভবন, সড়ক ও ফুটপাত বৃষ্টির পানিকে মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
সবচেয়ে জরুরি হলো কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা। ওয়াসার ২৪ ঘণ্টা খোলা হটলাইন ১৬১৬২ আছে, কিন্তু অভিযোগ কত দ্রুত ও কীভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে, তার তথ্য প্রকাশ না হলে হটলাইন কেবল নম্বরই থেকে যায়। অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে কর্তৃপক্ষকে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। জবাবদিহি কোনো বাড়তি সুবিধা নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব।
পানির অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়
পুরান ঢাকার এই দুর্ভোগ মনে করিয়ে দেয়, নগর উন্নয়নের আলোচনায় মানুষের মৌলিক চাহিদা আড়ালে রাখা যায় না। নিরাপদ পানির জন্য যদি দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়, তবে সেই শহরের আধুনিকতা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
প্রশ্নটি তাই শুধু পুরান ঢাকার নয়। নাগরিক সেবার পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষের জীবন কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? উন্নয়নের সুফল কি সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে, নাকি মৌলিক সুবিধার জন্যও প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে?
যে শহরে মানুষ বসবাস করে, কাজ করে, অর্থনীতিতে অবদান রাখে, সেখানে নিরাপদ পানি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। পুরান ঢাকার মানুষের হাতে পানির পাত্র নয়, ঘরে ঘরে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার।
তাই উন্নয়ন হতে হবে বাসিন্দাদের স্বার্থে। যে উন্নয়ন মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটায় না, তা কাগজে-কলমে অর্জন হলেও বাস্তবে অসম্পূর্ণ।
কারণ, উন্নয়নের আসল মাপকাঠি বহুতল ভবন বা ঝকঝকে সড়ক নয়, মানুষের জীবন কতটা সহজ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়েছে সেটিই।

