পুলিশের হাতে অপরাধ দমনের ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা কি কাউকে আদালতের বাইরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার দেয়? আইজিপির বক্তব্য নতুন করে সামনে এনেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা, নাগরিকের জীবনের অধিকার এবং বিচারব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্ন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন, সরকার যদি অনুমতি দেয়, আমরা সেটা করব।’ তাঁর এই বক্তব্য কেবল অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা কিংবা সরকারি অনুমতির প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহারের সাংবিধানিক সীমা নিয়ে গুরুতর বিতর্ক তৈরি করেছে।
রাজধানীর চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে পুলিশের কর্মপরিবেশ ও ক্ষমতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইজিপি আরও বলেন, পুলিশ লাঠিপেটা করলে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আবার নীরব থাকলে বলা হয় দুর্বল পুলিশ। দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে ক্ষমতায়িত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
পুলিশকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই শক্তির অর্থ কী? অপরাধীকে শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করার সক্ষমতা, নাকি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে হত্যা করার স্বাধীনতা?
সরকার অনুমতি দিলেই কি কোনো হত্যাকাণ্ড বৈধ হয়ে যায়? অপরাধ দমনে পুলিশের হাতে কী ধরনের ক্ষমতা রয়েছে, আর সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এসব প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট থাকার সুযোগ নেই।
‘ক্রসফায়ার’ শব্দের আড়ালে যে বাস্তবতা
‘ক্রসফায়ার’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আলোচনায় শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ‘গোলাগুলি’ কিংবা ‘ক্রসফায়ার’-এর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনার কোনো কোনোটি নিয়ে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন মহল গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

এখানে একটি পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি—অভিযানে কেউ নিহত হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়। তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী হামলা প্রতিহত করতে কিংবা নিজের ও অন্যের জীবন বাঁচাতে আইনসম্মত বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই বলপ্রয়োগের বৈধতা নির্ভর করে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি, তাৎক্ষণিক হুমকি, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার ওপর। শুধু ‘ক্রসফায়ার’ নাম দিলেই কোনো হত্যাকাণ্ড বৈধ হয়ে যায় না।
একইভাবে, কোনো ব্যক্তি অপরাধী বলে সন্দেহভাজন, তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে কিংবা তিনি জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক—এসবের কোনোটিই তাঁকে বিচার ছাড়া হত্যা করার অনুমতি দেয় না।
অপরাধ দমন এবং শাস্তি প্রদান এক বিষয় নয়। পুলিশের প্রধান দায়িত্ব অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অপরাধ প্রমাণ করে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব স্বাধীন আদালতের। এই সীমারেখা ভেঙে গেলে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানই বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
সরকারের অনুমতি কি আইনের ঊর্ধ্বে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ৩৫ অনুচ্ছেদের ৫ উপ-অনুচ্ছেদে নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড কিংবা আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই সাংবিধানিক সুরক্ষার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো নাগরিকের জীবন কেড়ে নিতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতাও সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সীমার মধ্যে পরিচালিত হতে হবে।
দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায় ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার ও তার সীমা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষা কিংবা অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্য বলপ্রয়োগ আইনসম্মত হতে পারে। কিন্তু এই অধিকার সীমাহীন নয়। তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী হুমকি প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ এবং আটক ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
নির্বাহী বিভাগের অনুমোদন আইনের বিকল্প নয়, দায়মুক্তির সনদও নয়।
সরকারের কোনো নির্দেশ বা অনুমতি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না। নির্বাহী বিভাগের অনুমোদন আইনের বিকল্প নয়, দায়মুক্তির সনদও নয়। কোনো পদক্ষেপ আইনসম্মত কি না, তা নির্ধারিত হবে সংবিধান ও প্রযোজ্য আইন অনুসারে—কেবল আদেশদাতার পরিচয় দিয়ে নয়।
সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের ১ উপ-অনুচ্ছেদে অপরাধ সংঘটনের সময় বলবৎ আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দণ্ডিত না করার সুরক্ষাও রয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।
‘শক্তিশালী পুলিশ’ মানেই কি গুলির ক্ষমতা?
পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনার যৌক্তিকতা রয়েছে। অপরাধীকে গ্রেপ্তার, সন্ত্রাস দমন, অস্ত্র উদ্ধার, জিম্মি উদ্ধার এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রশিক্ষণ, জনবল, প্রযুক্তি ও আধুনিক সরঞ্জাম প্রয়োজন। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিজের ও অন্যের জীবন রক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও পুলিশের থাকতে হবে।
কিন্তু ক্ষমতায়ন আর জবাবদিহিহীনতা এক বিষয় নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশকে যেমন দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হয়, তেমনি সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও রাখতে হয়।
পুলিশের শক্তি পরিমাপের মানদণ্ড কতজনকে গুলি করা হলো, কতজন অভিযুক্ত নিহত হলো কিংবা কত দ্রুত কোনো অভিযান শেষ হলো—এসব হতে পারে না। বরং কতটা দক্ষতার সঙ্গে অপরাধীকে জীবিত গ্রেপ্তার করা গেল, কতটা নির্ভুলভাবে অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করা গেল, কত দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন হলো এবং সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করল—এসবই হওয়া উচিত সক্ষমতার প্রকৃত মাপকাঠি।
আইনের সীমার মধ্যে দৃঢ়তা দুর্বলতা নয়। বরং আইনের বাইরে গিয়ে শক্তি প্রদর্শন অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতিকে আড়াল করে।

অতীতের অভিজ্ঞতা: যে প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি জরুরি
বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠনের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার উদ্বেগ জানিয়েছে।
২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ উদাহরণ। ওই মামলায় র্যাবের সদস্যদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর আদালত সাজা দেন। ঘটনাটি দেখিয়েছে, রাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের সদস্যরাও ক্ষমতার অপব্যবহার করলে অপরাধের দায় থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না।
২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযান ঘিরে বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ওই বছর পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৪৬৬ জন। একই বছর টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের প্রকাশ করা অডিও রেকর্ডিং ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। তাঁর পরিবারের করা হত্যা মামলায় ২০২২ সালে টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। ২০২৫ সালের জুনে হাইকোর্টও তাঁদের সাজা বহাল রাখেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কেউ নিহত হলেই বাহিনীর দেওয়া বর্ণনাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া অপরিহার্য।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানি, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তথ্য-অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষের নিহত হওয়ার অনুমান তুলে ধরা হয়; প্রতিবেদনে অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিকে দায়ী করা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘ক্রসফায়ার’ করার সম্ভাবনার কথা উচ্চারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের দর্শনে কি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, নাকি অপরাধ দমনের পুরোনো যুক্তিগুলোই নতুন পরিস্থিতিতে ফিরে আসছে?
তবে একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো পুলিশ বাহিনী বা সরকারের নীতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়াও ঠিক হবে না। বক্তব্যটির সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট, সম্ভাব্য নির্দেশনা এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার হওয়া দরকার। একই সঙ্গে আইজিপির বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে সাংবিধানিক ও মানবাধিকারের প্রশ্ন উঠেছে, তার স্পষ্ট জবাবও প্রয়োজন।

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও কি পুরোনো মানসিকতার পুনরাবৃত্তি?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। সেই প্রেক্ষাপটে পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার’ করার বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
সংবিধানবিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আরিফ খানের মতে, এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ভবিষ্যতে সরকারকে নীতিগত জটিলতায় ফেলতে পারে। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক বিষয়: পুলিশকে অস্ত্র দেওয়া হয় নাগরিকের সুরক্ষার জন্য, বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়।
আইজিপির বক্তব্য সরকারকেও একটি নীতিগত অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটলে এই বক্তব্যের সূত্র ধরে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমতি দিয়েছে—এমন ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু আইজিপির বক্তব্যের নয়; সরকারের অবস্থান কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচিত সরকার বা প্রশাসন পরিবর্তিত হলেই রাষ্ট্রের পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর সংস্কৃতি বদলে যায় না। সংস্কার তখনই অর্থবহ হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা সরকারের তাৎক্ষণিক ইচ্ছার পরিবর্তে সংবিধান, আইন ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
অপরাধীর অধিকার রক্ষা মানে কি অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া?
বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরোধিতাকে কখনো কখনো অপরাধীর প্রতি সহানুভূতি হিসেবে দেখানো হয়। এই যুক্তি বিভ্রান্তিকর। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী নয়।
বরং নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত হলে প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বিপরীতে, বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি তদন্তের দুর্বলতা আড়াল করতে পারে, সম্ভাব্য সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে পারে এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার সুযোগ নষ্ট করতে পারে।
অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। আর অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে পালন করতে হবে। রাষ্ট্র যদি অভিযোগকেই চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে নিরপরাধ মানুষও ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হতে পারেন।
আজ যে ক্ষমতাকে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, কাল সেই একই ক্ষমতা কোনো নিরীহ নাগরিক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার শিকার মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না—তার নিশ্চয়তা কোথায়?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড কী বলে?
আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ৬ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের সহজাত জীবনের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এই চুক্তির পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র। এতে স্বেচ্ছাচারীভাবে কাউকে জীবন থেকে বঞ্চিত করা নিষিদ্ধ।
জাতিসংঘের আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের বলপ্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মৌলিক নীতিমালায়ও বলা হয়েছে, বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক। প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর সীমা রয়েছে; জীবন রক্ষার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি ছাড়া তা গ্রহণযোগ্য নয়।
অতএব, অপরাধ দমনের নামে ‘ক্রসফায়ার’কে সাধারণ প্রশাসনিক বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের অনুমতি থাকলেও তা সংবিধান ও মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতার বিকল্প হতে পারে না।
সমাধান: শক্তিশালী পুলিশ, স্বাধীন বিচার ও কার্যকর জবাবদিহিতা
বাংলাদেশে অপরাধ দমনের জন্য পুলিশের কার্যকর ক্ষমতা অবশ্যই দরকার। তবে সেই ক্ষমতা আইনের মধ্যে থেকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার সুস্পষ্ট কাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথমত,সরকারের উচিত বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া এবং পুলিশের বক্তব্যে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা থাকলে তা দূর করা। অপরাধ দমনে কঠোরতার অর্থ যে বিচার ছাড়া হত্যা নয়, তা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের শর্ত এবং প্রতিটি প্রাণহানির পর তদন্তের পদ্ধতি স্বচ্ছ করতে হবে। অভিযোগ উঠলে তদন্ত যেন অভিযুক্ত বাহিনীর প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত,অপরাধ তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তি, ফরেনসিক সক্ষমতা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং দক্ষ প্রসিকিউশন বাড়াতে হবে। এতে অপরাধীকে হত্যা করে নয়, আইনের আওতায় এনে দোষ প্রমাণের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে।
চতুর্থত,পুলিশের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সরকার, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর নির্দেশে আইনবহির্ভূত কাজ করার চাপ যেন পুলিশ সদস্যদের ওপর না আসে। একই সঙ্গে আইন ভাঙলে পদমর্যাদা নির্বিশেষে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত,হেফাজতে মৃত্যু কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মৃত্যুর প্রতিটি সন্দেহজনক ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রমাণ সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য গ্রহণ, ময়নাতদন্ত এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিচারিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে।

রাষ্ট্রের শক্তি প্রমাণের পরীক্ষা
রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র আছে, কারাগার আছে, আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আছে। কিন্তু রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক করে তোলে তার আত্মসংযম, আইনের প্রতি আনুগত্য এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার।
পুলিশ দুর্বল থাকুক—এটি কেউ চায় না। অপরাধী পার পেয়ে যাক—এটিও কাম্য নয়। কিন্তু অপরাধ দমনের নামে বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করাও কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
আইজিপির বক্তব্যের পর তাই সরকারের কাছে স্পষ্ট উত্তর প্রত্যাশিত: ক্রসফায়ার বলতে কি তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী হামলা প্রতিহত করতে আইনসম্মত বলপ্রয়োগ বোঝানো হচ্ছে, নাকি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে হত্যা করার সুযোগ? সরকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেবে? পুলিশের প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের সীমা কি পরিষ্কার করবে? আর অতীতের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল একটি বক্তব্যের বিতর্ক মেটানোর জন্য নয়; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ আইনশৃঙ্খলা নীতি কোন পথে এগোবে, তা নির্ধারণের জন্যও জরুরি।
অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, পুলিশকে দায়িত্ব পালনে সক্ষম করতে হবে। কিন্তু এর কোনোটিই বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অনুমতি হতে পারে না।
রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র আছে বলেই রাষ্ট্র যা ইচ্ছা করতে পারে না। বরং রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র আছে বলেই তার জবাবদিহি আরও কঠোর হওয়া উচিত। আইনের শাসনে পুলিশ অপরাধ দমন করবে, আদালত বিচার করবে, আর সরকার নিশ্চিত করবে—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

