বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা অনেক। অনেক কোম্পানি এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের সুনাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। কেউ নিয়মনীতি মেনে চলে। কেউ ক্ষুদ্র মুনাফার আশা করে। কিন্তু সত্যি ফল খুব কমই আসে। কেন এমন হয়? কারণ আমাদের অর্থনীতির কাঠামোই পরিবেশ এবং সমাজের সীমারেখার সঙ্গে খাপ খায় না। বাজার সাপেক্ষে আজকের ব্যবসা মডেল প্রাকৃতিক সীমারেখাকে উপেক্ষা করে এবং সংস্থাগুলোকে দ্রুত লাভের দিকে ধাবিত করে। ফলে যারা প্রকৃতি রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেয়, তারা প্রাথমিক বিনিয়োগের ভারে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট হতে পারে না।
বাজারের এই স্বভাব বোঝা খুব জরুরি। উদাহরণ হিসেবে ধরুন একটি উৎপাদন কোম্পানি যা সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করে। এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে খরচ কমাবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্থিতিশীল করবে। কিন্তু বাজার শুধুই প্রাথমিক খরচ দেখে। বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুনাফা চান। ফলে এই ধরনের টেকসই উদ্যোগ প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ সংকটে পড়ে। অন্যদিকে যারা সম্পদ অপচয় করে, তারা সহজে কম খরচে মূলধন পায়।
এই বাস্তবতা বদলানোর জন্য প্রয়োজন “Aligned Capitalism”। এর মানে হলো এমন এক অর্থনীতি যেখানে ব্যবসার পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবকে মূল্যায়ন করা হয়। বাজার এই প্রভাবকে প্রতিফলিত করবে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করবে। আর্থিক প্রতিবেদনে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পুঁজি অন্তর্ভুক্ত হবে। ক্রেডিট রেটিংয়ে পরিবেশ ও সমাজের প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
টেকসই উদ্যোগ কেবল খরচের ভার নয় বরং লাভের উৎস হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি শক্তিশালী হবে। তারা উপকরণ কম ব্যবহার করে খরচ কমাবে। সরবরাহে স্বাধীনতা বজায় রাখবে। বাজারে জটিল পরিস্থিতিতেও তারা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
বিশেষ করে সফল উদাহরণ থেকে শেখা যায়। ব্রাজিলের প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান Natura স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে। এতে ব্যবসায় সাফল্য এবং সামাজিক উন্নয়ন দুইই হয়েছে। Interface, একটি বৈশ্বিক ফ্লোরিং কোম্পানি, তাদের “Mission Zero” প্রকল্পে কার্বন ফুটপ্রিন্ট ৭৪% কমিয়েছে। Schneider Electric টেকসই কৌশলকে ব্যবসার মূল অংশে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই কোম্পানিগুলো দেখিয়েছে কিভাবে টেকসই উদ্যোগ আর্থিক ও সামাজিকভাবে ফলপ্রসূ হতে পারে।
তবে শুধু কোম্পানির চেষ্টাই যথেষ্ট নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিনিয়োগকারী, শ্রমিক ইউনিয়ন, স্থানীয় সমাজ ও নাগরিক সংগঠন—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বল্পমেয়াদী মুনাফা থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্যবসার সফলতা শুধু টেকসই উদ্যোগের ওপর নির্ভর করবে না। রাজনৈতিক এবং বাজারিক পরিবেশেও সমন্বয় প্রয়োজন।
সর্বশেষে, ব্যবসা শিক্ষায়ও পরিবর্তন জরুরি। আজকের এমবিএ শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের অর্থনীতি গ্রহণ করবে। তাদেরকে শেখানো প্রয়োজন কিভাবে পরিবেশ ও সামাজিক বাস্তবতা অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। শুধু বর্তমান সম্পদ ব্যবস্থাপনা নয়, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কাঠামোও বুঝতে হবে।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এটি গত বছরের তুলনায় ৪৮% বেশি। গ্রিসে লিবিয়া থেকে আগমন বেড়েছে ১৭৩%। পশ্চিমা দেশগুলো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উর্সুলা ভন ডার লেইয়েন সব মহাদেশে শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থা চান। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার অবৈধ পারাপারকে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ একা সমস্যার সমাধান নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। খাদ্য সংকটই এখন অভিবাসনের প্রধান চালিকা শক্তি। আফ্রিকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই মহাদেশে গত দশকে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে। ২০২৩ সালে কেনিয়ায় ৪০ বছরের মধ্যে ভয়াবহ খরা হয়েছে। ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার খরা জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়ার ভুট্টা উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দিয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ সুদানের বন্যায় ৩ কোটি গবাদি পশু মারা গেছে।
এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। যদি একই প্রবণতা থাকে, আফ্রিকার ফসলের উৎপাদন ২০৫০ সালের মধ্যে ১৮% কমে যেতে পারে। একই সময়ে মহাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা। অন্য দেশগুলোতেও কৃষি উৎপাদন কমছে। আর্থিক ও সামাজিক চাপ বেড়ে যাবে। শহরমুখী অভিবাসন বাড়বে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
সমাধানের মূল পথ হলো জলবায়ু-সহনশীল কৃষি। এর মধ্যে আছে খরা সহনশীল ফসল, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, টেকসই কৃষি প্রযুক্তি। আফ্রিকায় প্রায় ৬০% মানুষ এখনো এসব প্রযুক্তির বাইরে। এজন্য আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও মডেল ফার্ম প্রয়োজন। কৃষকদের দক্ষতা বাড়ালে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমবে। সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা মিলিতভাবে এই উদ্যোগকে সমর্থন করতে হবে।
দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। প্রথম, সরকারি গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু-সহনশীল ফসলের বাজার তৈরি করতে Advance Market Commitment পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। দ্বিতীয়, নতুন প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ ও অনুমোদনের জন্য নীতি পরিবর্তন জরুরি। প্রিসিশন এগ্রিকালচার, জিন সম্পাদিত ফসল, বিকল্প প্রাণী খাদ্য প্রযুক্তি দ্রুত প্রবর্তন করতে হবে।
যা বোঝা যায় তা হলো সীমান্ত সুরক্ষা ও অভিবাসন দমন কৌশল যথেষ্ট নয়। মূল সমস্যা হলো খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজন। এই দুই ক্ষেত্রের উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে অভিবাসন চাপ ভয়াবহ হবে। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া কোনো সরকার একাই এই সমস্যা সামাল দিতে পারবে না।

