২০২৪ সালের শেষে এসে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দীর্ঘদিনের গোপন খেলাপি ঋণ ও ক্ষতির হিসাব সামনে আসতেই ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। মূলধন সংরক্ষণের হার (সিআরএআর) নেমে আসে মাত্র ৩.০৮ শতাংশে—যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত মাত্রার অর্ধেকেরও কম। অথচ ভারতে এ হার ১৬.৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৮.৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ২০.৬ শতাংশ, এমনকি ছোট অর্থনীতির নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তানেও হার ১০ শতাংশের ওপরে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বেসেল-৩ অনুযায়ী ন্যূনতম প্রয়োজন ১২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ তার ধারে কাছেও নেই।
সংখ্যাগুলো আরও হতবাক করে দেয়। ২০২৪ সালের শেষে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা—দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মোট ঋণের প্রায় ৪৫ শতাংশই এখন অচল বা ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু খেলাপি ঋণই ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি এবং অবলোপনকৃত ঋণ ৬২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ অঙ্ক প্রায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সমান।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে। ইসলামি ব্যাংকগুলোর সিআরএআর যেখানে ২০২৩ সালে ছিল ১২.৭১ শতাংশ, ২০২৪ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪.৯৫ শতাংশে। সাতটি ইসলামি ব্যাংকের ব্যাপক ক্ষতি পুরো খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, মাত্র ৪২টি ব্যাংক সিআরএআর মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে। বাকি ব্যাংকগুলো দায়ের বোঝা বহন করছে সম্পদের চেয়েও বেশি।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান এই পরিস্থিতিকে বলেছেন কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। তার ভাষায়, প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক স্থাপনের সময় প্রাথমিক মূলধন ছিল মাত্র ৩ কোটি টাকা। পরে আমানত ও ঋণের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও মূলধন বাড়ানো হয়নি, ফলে ব্যাংকগুলো দুর্বলই থেকে গেছে। তার মতে, “মূলধনভিত্তি দুর্বল হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারবে না। আসলে জমা টাকাও প্রায় শেষ হয়ে গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মও মানতে পারছে না।”
শুধু ব্যাংক নয়, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও ভয়াবহ। ২০২৪ সালে তাদের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৮৩ শতাংশে, আর মূলধন সংরক্ষণের হার নেমে গেছে ঋণাত্মক ৬.৪৬ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা—দেশের দুই বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা যদি খেলাপি হয়ে যায়, গোটা খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাইবার হামলার নতুন হুমকি।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং খাতের দেশে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোগত দুর্বলতা, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ আর পর্যাপ্ত মূলধনের ঘাটতি কাটিয়ে না উঠলে অর্থনীতি টেকসই হতে পারবে না।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলীর মন্তব্যেই যেন বাস্তবতা ফুটে ওঠে:
“এটাই সত্যি—বিগত সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া অব্যবস্থাপনার ফল এখন পুরো আর্থিক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পুনরুদ্ধারে সময় লাগবেই।”

