টানা তিন অর্থবছর পতনের পর আবারও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ বাড়তে শুরু করেছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর ফলে গত ডিসেম্বর শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪১ হাজার ২৫৩ কোটি টাকায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তুলনামূলকভাবে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমার গতি ধীর হওয়ায় সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ আবারও কিছুটা বাড়ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি চলতি অর্থবছরে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে।
সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণের হিসাব নির্ধারিত হয় মোট বিক্রি থেকে সুদ ও আসল পরিশোধ বাদ দিয়ে। এই নিট বিক্রি টানা তিন অর্থবছর কম থাকায় সরকারের ঋণ স্থিতিও ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। ২০২২ সালের জুন শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ ছিল ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১০ কোটি টাকা। সেখান থেকে কমে ২০২৫ সালের জুন শেষে তা নেমে আসে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ কমে ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। তার আগের ২০২৩–২৪ অর্থবছরে কমেছিল ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা এবং ২০২২–২৩ অর্থবছরে কমে ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। তবে এর আগে ২০২১–২২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ বেড়েছিল ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, একসময় ব্যাংকের তুলনায় বেশি সুদের কারণে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাজেট লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ছাড়িয়ে যেত। তখন সরকারের ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে একাধিক দফায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হয়। অন্যদিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বাড়লেও সঞ্চয়পত্রে তা তুলনামূলক কম ছিল। এর প্রভাবে গত তিন অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে আসে, আর একই সময়ে বিল ও বন্ডে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
তবে গত কয়েক মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার কমে ১০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। যেখানে এক বছর আগে এই হার ছিল প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। এই পরিবর্তন আবারও সঞ্চয়পত্রকে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সরকার প্রতি বছরই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। আগের অর্থবছরের মূল বাজেটে এই লক্ষ্য ছিল ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়।
এদিকে ব্যাংক খাত থেকে চলতি অর্থবছরে সরকার ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকার এর মধ্যে ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগের অর্থবছরে ৯৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, দেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রভাব ও দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অন্যান্য কারণেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর অপরিবর্তিত!
সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর দীর্ঘদিন ধরেই ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হচ্ছে। তবে গত জানুয়ারিতে হঠাৎ করে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটায় সঞ্চয়কারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট করেছে, পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগে উৎসে কর ৫ শতাংশই বহাল থাকবে। সব ধরনের সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে কোনো ব্যক্তির বিনিয়োগ পাঁচ লাখ টাকার বেশি না হলে মুনাফার ওপর একই হার প্রযোজ্য হবে।

