ইসলামের পবিত্রতম স্থান কাবা শরিফের আবরণ ‘কিসওয়া’র কয়েকটি অংশ কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের কাছে পাঠানো হয়েছিল— এমন তথ্য নথিতে উঠে আসার পর বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গত ৩০শে জানুয়ারি এপস্টিন–সংক্রান্ত নথিপত্র প্রকাশ করে। সেখানে ২০১৭ সালের কয়েকটি ইমেইল আদান–প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়।
ইমেইলগুলোতে উল্লেখ আছে, সৌদি আরব থেকে কাবার আবরণ ‘কিসওয়া’র বলে দাবি করা তিনটি কাপড়ের টুকরো ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থিত এপস্টিনের বাসভবনে পাঠানো হয়েছিল।
একজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান থেকে একটি অংশ পাঠানো হলো সবচেয়ে নোংরা মানুষের কাছে। এটি কল্পনাতেও আনা যায় না।”
২০১৪ সালের একটি ছবিতে দেখা যায়, এপস্টিন ও আরেক ব্যক্তি মাটিতে রাখা একটি কাপড় পরীক্ষা করছেন। কাপড়টি দেখতে কাবার দরজার ওপর থাকা কিসওয়ার নকশাদার অংশের মতো মনে হয়। আরেকজন এক্স ব্যবহারকারী লেখেন, ছবিটি “আমার হৃদয় ভেঙে দিয়েছে।” কারণ কিসওয়া, যা কাবার আবরণ হিসেবে পরিচিত, সেটিকে “মেঝেতে কার্পেটের মতো বিছানো” দেখা গেছে।

তবে ছবিটির সঙ্গে ২০১৭ সালে কিসওয়ার অংশ পাঠানোর নথির সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না তা নিশ্চিত নয়। ছবির কাপড়টি সত্যিই কিসওয়ার অংশ ছিল কি না সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
মসজিদ:
কালো রেশমে তৈরি কিসওয়ার ওপর সোনা ও রুপার সূতো দিয়ে পবিত্র কোরআনের আয়াত সূচিকর্ম করা থাকে। এটি মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রে অবস্থিত পবিত্র কাবার চারটি বাইরের দেয়াল সম্পূর্ণভাবে ঢেকে রাখে।
প্রতি বছর লাখ লাখ মুসলিম তীর্থযাত্রীর স্পর্শের পর কিসওয়া পরিবর্তন করা হয়। ইসলামী নতুন বছর উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন কিসওয়া স্থাপন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সংরক্ষণাগারে এপস্টিনের কর্মীদের সঙ্গে ‘আজিজা আল-আহমাদি’ নামের একটি ইমেইল ঠিকানার আদান–প্রদানের নথি রয়েছে। সেখানে ২০১৭ সালে কিসওয়ার তিনটি অংশ এপস্টিনের কাছে পাঠানোর আয়োজনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনটি অংশের একটি ছিল সবুজ। যা কাবার ভেতরের অংশ থেকে বলে উল্লেখ করা হয়। আরেকটি ছিল কালো কাপড়, যা বাইরের আবরণের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত। তৃতীয়টি ছিল সূচিকর্ম করা লেখা, যা একই উপকরণে তৈরি হলেও ব্যবহার করা হয়নি।
২০১৭ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারির এক ইমেইলে বলা হয়, আহমাদি নামে পরিচিত একজনের সহকারী এপস্টিনের কর্মীদের জানান তারা “মসজিদের জন্য কাবার কিছু অংশ পাঠাবেন।” এখানে ‘মসজিদ’ বলতে এপস্টিনের সম্পত্তির কোনো স্থাপনা বোঝানো হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়।
এ পর্যন্ত প্রকাশিত নথিতে দ্বীপে কোনো মসজিদের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তবে বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নথিতে একটি ছোট ভবনকে ‘মন্দির’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিপত্রে ঠিক কোন স্থাপনাকে বোঝানো হয়েছে তা পরিষ্কার নয়।
নথিতে ব্যবহৃত ‘মসজিদ’ শব্দটি যেন মক্কার মসজিদুল হারামের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা হয়, যেখানে পবিত্র কাবা অবস্থিত।
নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৪ঠা মার্চ চালানটি এপস্টিনের পাম বিচের বাড়িতে পৌঁছায়। পরে সেখান থেকে মার্কিন ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের সেন্ট থমাসে পাঠানো হয়। এটি তার ব্যক্তিগত দ্বীপ লিটল সেন্ট জেমসের কাছাকাছি। একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, সেখানে তাদের পাচার ও নির্যাতন করা হয়েছিল।
২০১৭ সালের ১৪ই মার্চের একটি মার্কিন শুল্ক ফরমে চালানটিকে ‘চিত্র, অঙ্কন ও প্যাস্টেল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত মূল্য ছিল ১০ হাজার ৯৮০ মার্কিন ডলার।
২১শে মার্চের একটি ইমেইলে নিশ্চিত করা হয়, কিসওয়ার অংশগুলো “মিস্টার এপস্টিনের বাড়িতে” পৌঁছেছে।
চালান পাঠানোর পর আহমাদির অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো আরেকটি ইমেইলে জানানো হয়, কালো অংশটি “কমপক্ষে এক কোটি মুসলিম, সুন্নি, শিয়া ও অন্যান্য মতের মানুষের স্পর্শে এসেছে।”
ইমেইলে আরও বলা হয়, “তারা কাবার চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ করে। এরপর প্রত্যেকে যতটা পারে স্পর্শ করার চেষ্টা করে। তাদের দোয়া, ইচ্ছা, অশ্রু ও আশা এই অংশে অর্পণ করে।”

তবে স্পষ্ট নয়, এপস্টিন এগুলো উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন কি না বা সেগুলো আসল কিসওয়ার অংশ ছিল কি না। বিচার বিভাগের নথি বলছে, সৌদি আরব থেকে এটি তার কাছে প্রথম চালান ছিল না।
২০১৭ সালের ২৭শে জানুয়ারির একটি ইমেইল ধারায় দেখা যায়, আহমাদির সহকারী হিসেবে পরিচিত একজন “মসজিদের ভেতরের ছবি” চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল “মসজিদের ভেতরের কিছু উপস্থাপন করা।”
একই ধারার আগের অংশে এপস্টিনের এক সহকারী নিশ্চিত করেন, “তাঁবু ও অন্যান্য গৃহস্থালি সামগ্রী” তার বাসায় পৌঁছেছে।
নথিতে একটি দলিল রয়েছে। সেখানে ঐতিহ্যবাহী আরবীয় উলের তাঁবু ও অন্যান্য জিনিস যেমন কার্পেট, কফির পাত্র, কাপ ও বিভিন্ন পাত্রের ছবি আছে। তবে এসব জিনিস একই চালানে পাঠানো হয়েছিল কি না তা নিশ্চিত নয়।
উভয় চালানই করা হয়েছিল ২০০৮ সালে এপস্টিন যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর। সে সময় তার বিরুদ্ধে পতিতাবৃত্তিতে প্ররোচনা দেওয়ার দুটি অভিযোগ ছিল। যার একটি অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
আহমাদি বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি। নথিতে কারও নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়।
এ পর্যন্ত পর্যালোচিত নথিতে তার দ্বীপে কোনো মসজিদ থাকার নির্দিষ্ট প্রমাণ বা অবস্থান উল্লেখ নেই। যদিও ইমেইলে এমন শব্দ ব্যবহার হয়েছে।
জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে এপস্টিন একটি মন্দিরসদৃশ স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। ২০১৭ সালের এক ঘূর্ণিঝড়ে ভবনটির সোনালি গম্বুজ উড়ে যায়।
তবে ইমেইলে উল্লেখিত ‘মসজিদ’ বলতে এই ভবন বোঝানো হয়েছিল কি না, নাকি তার সম্পত্তির অন্য কোনো স্থাপনা, তা নিশ্চিত নয়।
নথিতে ব্যবহৃত ‘মসজিদ’ শব্দটি যেন মক্কার কাবা-ঘেরা মসজিদুল হারামের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি না করে।

মর্যাদার, তবে পবিত্র নয়:
সৌদি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণেই কিসওয়া তৈরি, স্থাপন, অপসারণ ও পুরনো কিসওয়ার ব্যবস্থাপনা হয়। তবে পুরনো কিসওয়া বিতরণ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।
বিবিসি এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে প্রকাশ পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
হজ ও উমরাহবিষয়ক লেখক আহমেদ আল-হেলাবি বিবিসি আরাবিকে বলেন, সোনালি ও রুপালি সূতোয় লেখা অংশ, যা সাধারণত ‘বেল্ট’ ও ‘সামাদিয়াস’ নামে পরিচিত, কেবল সৌদি রয়্যাল কোর্টের কর্মকর্তারাই উপহার দিতে পারেন। এগুলো সাধারণত মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, বাকি কালো কাপড় ছোট অংশে কেটে তুলনামূলক নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের দেওয়া হতে পারে।
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিল্প ইতিহাসবিদ ড. সাইমন ও’মিয়ারা বলেন, কিসওয়া “স্বভাবগতভাবে পবিত্র” নয়। তবে মুসলিম বিশ্বে এটি অত্যন্ত সম্মানিত।
তিনি বলেন, “এটি কাবার মর্যাদা রক্ষা করে। অনেকটা রাজার পোশাকের মতো। কাবা থেকে সরানোর পরও এটিকে অসম্মান করা যায় না। এর ওপর পা রাখা হয় না।”
অন্যদিকে হেলাবি প্রশ্ন তোলেন, চিঠিপত্রে উল্লেখিত অংশগুলো আদৌ আসল কি না। তিনি আরও বলেন, কিসওয়া অমুসলিমদের উপহার হিসেবে দেওয়া বৈধ নয়।

সৌদি আরবের সঙ্গে সংযোগ:
বিচার বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের শুরু থেকে ২০১৯ সালের শুরু পর্যন্ত এপস্টিনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বহু ইমেইল আদান–প্রদান হয়। সেখানে ‘আহমাদি’ নামে স্বাক্ষর দেখা যায়।
কিছু ইমেইলে তাকে “বস” ও “মাস্টার” বলে সম্বোধন করা হয়েছে। নথিতে ইঙ্গিত আছে, তারা নিউইয়র্ক ও প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে সাক্ষাৎ করেছেন।
নথি থেকে ধারণা করা হয়, আহমাদির মাধ্যমে সৌদি সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন এপস্টিন।
২০১৬ সালের জুলাইয়ের এক ইমেইলে দেখা যায়, আহমাদি “এইচই রাফাত” নামে একজনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ আয়োজনের চেষ্টা করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ওই ব্যক্তি এপস্টিনের সান্নিধ্য “উপভোগ করেন।”
এখানে ‘এইচই’ সম্ভবত ‘হিজ এক্সেলেন্সি’র সংক্ষিপ্ত রূপ। যা সৌদি আরবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
২০১৬ সালের আগস্টে পাঠানো এক ইমেইলে এপস্টিন “আর্থিক অবস্থা যাচাই” প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বিরোধিতা করেন। পরে আহমাদি জানান, বিষয়টি তিনি “পর্যালোচনা” করবেন। এবং “রাফাত আল-সাব্বাঘ” নামের একজনের ইমেইল ঠিকানা যুক্ত করেন।
২০১৬ সালের নভেম্বরের এক ইমেইলে এপস্টিনের সহকারী লেখেন, “আজিজা হলেন এইচই রাফাতের সহকারী।”
বিভিন্ন ইমেইলে এপস্টিন “রাফাত আল-সাব্বাঘ”-কে সৌদি যুবরাজের উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০১৭ সালে সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থার এক বিজ্ঞপ্তিতে তাকে “রয়্যাল কোর্টের পরামর্শক” বলা হয়।
নথির ইমেইল অনুযায়ী, “সাব্বাঘ” নামে একজনের সঙ্গে এপস্টিনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ২০১৬ সালের এক বার্তায় “রাফাত আল-সাব্বাঘ” নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, “আপনার বন্ধুত্ব আমি অত্যন্ত মূল্য দিই।”
একটি ইমেইলে ১৭ বছর বয়সী এক রুশ সুন্দরী প্রতিযোগীর কথা উল্লেখ ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি কুমারিত্ব বিক্রির উদ্দেশ্যে দুবাইয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
জবাবে এপস্টিন লেখেন, “অবশেষে তুমি আমাকে মূল্যবান কিছু পাঠালে।”
নথিতে আহমাদি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত। তবে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের এক ইমেইলে ওই নামে একজন এপস্টিনের কাছে তার মোবাইল গেম কোম্পানি নিয়ে পরামর্শ চান।
কিসওয়া এবং ইমেইলে উল্লেখিত ব্যক্তিদের সম্পর্ক নিয়ে এখনো বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত। মুসলিম বিশ্বজুড়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিবিসি

