১৩ ও ১৪ মে অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে ভোটার উপস্থিতির নিম্ন হার, রাজনৈতিক প্যানেলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রার্থিতা বঞ্চনার অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে একটি জটিল ও বিতর্কিত চিত্র সামনে এসেছে।
নির্বাচনে মোট ১১ হাজার ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ৪৮ জন, যা প্রায় ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি। গত পাঁচ বছরের তুলনায় এটিই সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দিনব্যাপী ভোটগ্রহণ শেষে বিএনপি-সমর্থিত নীল প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পায়। সভাপতি পদে এএম মাহবুবউদ্দিন খোকন এবং সম্পাদক পদে মোহাম্মদ আলী বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত-সমর্থিত সবুজ প্যানেলের প্রার্থীরা। নির্বাচনে মোট তিনটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, যেখানে এনসিপি-সমর্থিত লাল-সবুজ প্যানেলও অংশ নেয়।
তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের অংশগ্রহণ না থাকা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে সাদা প্যানেল হিসেবে পরিচিত এই অংশটি প্রথমবারের মতো নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাইরে থাকে। অভিযোগ উঠেছে যে, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ৪১-৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এ নিয়ে আইনজীবী মহলে অস্বস্তি ও বিতর্ক তৈরি হয়।
জানা যায়, অ্যাডহক কমিটি ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বিশেষ সাধারণ সভা করে সিদ্ধান্ত নেয়—আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
সুপ্রিম কোর্ট বারের ৭৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হলো।
একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে বিরোধী দলের ওপর নানা দমনপীড়ন চালানো হলেও আইনজীবী সমিতির মতো পেশাজীবী সংগঠনগুলোয় বিএনপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করতে পেরেছেন। সুপ্রিম কোর্ট বারেও বিএনপির প্রার্থী এএম মাহাবুব উদ্দিন খোকন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে—রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে কি পেশাজীবী সংগঠনগুলোর গণতান্ত্রিক পরিবেশও বদলে গেল?
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে আইনজীবী পিয়া জান্নাতুল (১৩ মে) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অভিযোগ করেন, শুধু আ.লীগপন্থী নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
নির্বাচন ঘিরে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হলো “টেকনিক্যাল মব” ধারণা। বিশিষ্ট আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এক ভিডিও বক্তব্যে দাবি করেন, সরাসরি সহিংসতা না থাকলেও প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অংশকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তার মতে, এটি এক ধরনের “টেকনিক্যাল মব”, যেখানে আনুষ্ঠানিক নিয়মের আড়ালে অংশগ্রহণ সীমিত করা হচ্ছে। তার এই মন্তব্য আইনজীবী অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে।
নির্বাচনের আগে, বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেছিলেন— ‘যে কারণে তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, একই কারণে বার নির্বাচনেও সুযোগ পাচ্ছেন না।’
|
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের দ্য ল সোসাইটি এক চিঠিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন বার নির্বাচন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া, শারীরিক হয়রানি এবং পুলিশের হস্তক্ষেপের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চিঠিতে বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে “অপসারিত” বা “অবাঞ্ছিত” হিসেবে চিহ্নিত করে প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে, যা আইনজীবীদের স্বাধীন অংশগ্রহণের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
দ্য ল সোসাইটি জাতিসংঘের আইনজীবীদের স্বাধীনতা সংক্রান্ত নীতিমালার উল্লেখ করে বলেছে, আইনজীবীদের পেশাগত কার্যক্রমে ভীতি প্রদর্শন, বাধা বা রাজনৈতিক প্রভাব গ্রহণযোগ্য নয়। সংগঠনটি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সব পক্ষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অনিয়ম তদন্ত করা এবং আইনজীবীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।

গণতান্ত্রিক সংকোচন ও আস্থার সংকট
আইনজীবী সমিতির সাম্প্রতিক নির্বাচন ঘিরে অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়ে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা গণতান্ত্রিক চর্চার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্দিষ্ট অংশের অংশগ্রহণ কার্যত সীমিত থাকায় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে, যা ভোটার উপস্থিতি ও সামগ্রিক অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি ন্যায্যতা, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির মৌলিক নীতির প্রতিফলন। যখন এসব নীতি দুর্বল হয়, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের প্রবণতা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংহতি দুর্বল করতে পারে এবং পেশাজীবী সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আইনজীবীরা রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার অংশ। তাদের সংগঠনের নির্বাচন যদি বিতর্ক, বর্জন ও একতরফা প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়—তবে গণতন্ত্রের শেষ আশ্রয় কোথায় দাঁড়াবে?
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যদি আদালতপাড়ার নির্বাচনেই সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের ন্যায্যতা কোথায় খুঁজবে?

