সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিষয়ে মামলা, অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় আইনগত কোনো বাধা নেই বলে মত দিয়েছেন দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট আইনজীবী। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় করা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের জন্য সংবিধান সুরক্ষা দিলেও ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে সেই দায়মুক্তি প্রযোজ্য নয়।
আইনজীবীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রমের জন্য আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকার সময় বা এর আগে যদি কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে ফৌজদারি বা দেওয়ানি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শনিবার একটি জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে আলাপকালে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এমন মত দেন। তারা উদাহরণ হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় বিচার হয়েছে এবং তাকে কারাভোগও করতে হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি দাবি করেছেন, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
গতকাল শনিবার তিনি বলেন, “কিসের বিচার করবে? আমি কি কোনো অপরাধ করেছি? আমাকে হেয় করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে।” শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার বিকাল ৫টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি ছিলেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথনের অভিযোগ। এছাড়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনারসহ বিভিন্ন দায়িত্বে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আড়াল করা, ব্যাংক খাতে দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং জুলাইয়ের গণআন্দোলনের সময় ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ তুলেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিচারের দাবিও জানিয়েছে তারা।
এদিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা থাকলে তা যাচাই করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, মামলা থাকলে সেগুলো কী উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, সেটিও পর্যালোচনা করা হবে। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকারবিষয়ক এক পরামর্শ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এ কথা জানান।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। সংবিধান অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের ২৩ এপ্রিল। তবে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে শুক্রবার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।
তার পদত্যাগের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে—রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না। বিশেষ করে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে দেওয়া রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির বিষয়টি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির জন্য দুটি ধরনের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। এর প্রথম অংশ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনের সময় কোনো কাজ করলে, কিংবা দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে বা নিষ্ক্রিয় থাকলে, সে বিষয়ে কোনো আদালতে তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা যাবে না। তবে এই সুরক্ষা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে না।
অন্যদিকে ৫১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের বা চলমান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তার গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোনো আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
ব্যক্তিগত অপরাধ হলে বিচার সম্ভব: বিশেষজ্ঞদের মত
মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। তার পদত্যাগের পর এসব অভিযোগের বিচার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। তবে সাহাবুদ্দিনের দাবি, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রপতির পদে থাকাকালীন বা এর আগে ব্যক্তিগত কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার করা যাবে কি না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদ মূলত রাষ্ট্রপতি পদে থাকা ব্যক্তির সুরক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। এটি সব ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দেয় না। তার মতে, দুর্নীতি, ফৌজদারি অপরাধ কিংবা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। তাই পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির সব কর্মকাণ্ডের জন্য পূর্ণ দায়মুক্তি দেয় না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে কোনো অপরাধ, দুর্নীতি বা ফৌজদারি কর্মকাণ্ড থাকলে সেসব বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চালানোর সুযোগ রয়েছে।
আগের অপরাধের বিচারেও বাধা নেই: চিফ প্রসিকিউটর
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা নেই বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময়কার দায়িত্ব পালনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের বা পদ ছাড়ার পর সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে কোনো সুরক্ষার কথা বলা হয়নি। তাই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধা নেই বলে তিনি মনে করেন।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তার মতে, সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময় কোনো অপরাধ করে থাকলে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় কেন উত্থাপন করা হয়নি। তার মতে, সংবিধানের নির্ধারিত সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে এখন আইনজ্ঞদের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত আলোচনা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পর কারাবরণের নজির আছে এরশাদের ক্ষেত্রে:
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর আইনি জটিলতায় পড়ার নজির রয়েছে বাংলাদেশে। এর উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘটনা। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়েন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। প্রায় নয় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পর পদত্যাগের পরপরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।
ক্ষমতা ছাড়ার পর বিশেষ আইনের আওতায় এরশাদকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়। এর মধ্যে জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় এবং প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন মামলার কারণে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছিল সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ছয় বছর কারাবন্দি ছিলেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এরশাদের এই ঘটনা দেখায় যে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যাওয়ার পর ব্যক্তিগত অপরাধ বা দুর্নীতির অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার নজির বাংলাদেশে রয়েছে।
বিশ্বে নজির: ক্ষমতা ছাড়ার পর সাবেক শীর্ষ নেতার বিচার
রাষ্ট্রপ্রধানদের পদত্যাগের পর আইনি জটিলতায় পড়ার নজির শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রয়েছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
২০২৪ সালে সামরিক আইন জারির ব্যর্থ উদ্যোগ এবং পরবর্তী ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলায় ইউন সুক ইওলের সাত বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। ২০২৬ সালের ৯ জুলাই দেওয়া এক রায়ে আদালত আগের সাজা বহাল রাখে।
মামলায় অভিযোগ ছিল, সামরিক আইন জারির আগে মন্ত্রিসভার স্বাভাবিক আলোচনা প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন ইউন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে। পরে সংসদ সামরিক আইন বাতিল করার পর নিজের গ্রেফতার ঠেকাতে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। এই ঘটনা নিয়ে আইনজ্ঞদের আলোচনা হলো—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিরাও ব্যক্তিগত বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে নন।
সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে যেসব অভিযোগ:
মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৩ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তার নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন ওঠে।
এর আগে বিচারক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে দুদক কমিশনার থাকাকালে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতি অনুসন্ধানে তিনি কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সুবিধা করে দিয়েছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাহাবুদ্দিনের পক্ষ থেকে কোনো স্বীকৃতি নেই এবং তিনি বিভিন্ন সময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুদক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি বেসরকারি ব্যাংক খাতের সঙ্গেও যুক্ত হন। এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, দুদকে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিষয়ে তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ছিল।
দুদক কমিশনার থাকাকালে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ:
মো. সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। ওই সময় তাকে ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত একটি দুর্নীতি মামলার তদন্ত প্রভাবিত করতে সাহাবুদ্দিনসহ দুদকের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ।
এ ঘটনায় ২০১৪ সালের ৭ অক্টোবর দুদকের শাহবাগ থানায় একটি মামলা করা হয়। পরবর্তী তদন্তে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার দাবি করেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তবে শেষ পর্যন্ত সাহাবুদ্দিনকে ওই মামলায় আসামি করা হয়নি।
এছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও সে সময় দুদকের তদন্তে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা আলোচনায় আসে। বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে দুদকের তদন্তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি দাবি করেছিলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির কোনো পরিকল্পনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তার সমালোচকদের অভিযোগ, ওই তদন্তের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সাহাবুদ্দিনের বক্তব্য হলো, তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
পদ্মা সেতু থেকে বেসিক ব্যাংক:
মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ, বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি এবং ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সবকিছু এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক:
২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে ২০১৪ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলাটির কার্যক্রম শেষ করা হয়। তৎকালীন দুদক কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মো. সাহাবুদ্দিনও বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন, বিশ্বব্যাংকের চাপের কারণে ওই মামলা করা হয়েছিল এবং তদন্তে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগটি আবার আলোচনায় আসে। দুদক নতুন করে বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন জানান, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান ও কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন বিষয়টি আড়াল করেছিলেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি।
বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়েও প্রশ্ন:
দুদকের কমিশনার হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পালন করার সময় বেসিক ব্যাংকের বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির প্রায় ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৬টি মামলা করে দুদক। তবে ওই সময় ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের কাউকে মামলার আসামি করা হয়নি।
যদিও ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা পরিচালনা পর্ষদের হাতে ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ২০২৩ সালে দুদক ওই মামলাগুলোর মধ্যে ৫৮টির অভিযোগপত্রে শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করে। পরবর্তী সময়ে কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের আসামি করা সম্ভব হয়নি।
দুদকের কমিশনার পদ ছাড়ার পর মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তিনি স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন। সমালোচকদের অভিযোগ, দুদকে দায়িত্ব পালনের সময় এস আলম গ্রুপের বিষয়ে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল এবং পরবর্তীতে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাহাবুদ্দিনের পক্ষ থেকে কোনো অপরাধ স্বীকার করা হয়নি।
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার নিয়ে তদন্ত:
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার মালিকানা নিয়েও মো. সাহাবুদ্দিনের নাম আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে জেএমসি বিল্ডার্সের শেয়ার মালিকানা নিয়ে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এ ঘটনায় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ অনুসন্ধান ও তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। ফলে অভিযোগ, তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে দায়ের হয় রিট:
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার যোগ্যতা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে দুদক আইনের একটি ধারার ব্যাখ্যা নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক।
দুদক আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার দায়িত্ব শেষ করার পর প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য হবেন না। এই বিধানের কারণে প্রশ্ন ওঠে—দুদকের সাবেক কমিশনার হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হতে পারেন কি না। এ বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচন কমিশনের জারি করা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে দুটি রিট আবেদন করা হয়।
তবে হাইকোর্ট রিট দুটি খারিজ করে দেন। আদালত বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদ নয়। একই সঙ্গে আদালত উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের মতো নিয়োগপ্রাপ্ত হন না; তিনি নির্বাচিত হন। পরে হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিল বিভাগও একই অবস্থান বহাল রাখেন। ফলে মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে দুদক আইনের ৯ ধারার কোনো বাধা নেই বলে আদালতের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তি কতটা আইনি সুরক্ষা পাবেন, আর ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ উঠলে তাকে কতটা জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে—সাহাবুদ্দিন ইস্যুতে সেই পুরোনো প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সুরক্ষা দিলেও, ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে এর সীমা কোথায়—তা নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো পদই অনন্তকালীন ঢাল হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করাই হবে মূল পরীক্ষা। অভিযোগ সত্য হলে যেমন আইনের আওতায় আসতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকেও সুরক্ষা দিতে হবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে।
সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া। কিন্তু এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিল একটি মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে বসা ব্যক্তির জবাবদিহির সীমা কোথায়? আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য একই মানদণ্ড নিশ্চিত করা কতটা জরুরি?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের বিচারব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কতটা শক্তিশালী হবে।

