হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে স্বর্ণ চোরাচালানের ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। শুধু কৌশলই নয়, বদলেছে পাচারের রুটও। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, আগে যেখানে সাধারণত দুই থেকে আড়াই কেজির চালান ধরা পড়ত, সেখানে চলতি বছর থেকেই ১৫ কেজি বা তারও বেশি ওজনের বড় চালান দেশে আনার চেষ্টা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক তিনটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জব্দের ঘটনা বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা মনে করছেন, সংঘবদ্ধ চক্র এখন আরও বড় পরিসরে সক্রিয় হয়েছে। একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা করছেন, যেসব চালান ধরা পড়ছে না, সেগুলোর পরিমাণ আরও বড় হতে পারে।
বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে চোরাকারবারীরা আগের তুলনায় অনেক বড় চালান আনছে। তাদের ধারণা, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় যে স্বর্ণ উদ্ধার হচ্ছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশ বিমানবন্দর দিয়ে বের হওয়ার পর সেসব স্থানে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
তাদের মতে, আকাশপথে স্বর্ণ আনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একের পর এক চালান জব্দ হওয়ায় পাচারকারীরা এখন নতুন রুট ও নতুন কৌশল বেছে নিচ্ছে। এর জবাবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নজরদারি আরও জোরদার করেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারীমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তার দাবি, কঠোর নজরদারির কারণেই একের পর এক স্বর্ণের চালান আটক করা সম্ভব হচ্ছে।
গত ১৯ জুলাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে পরিচালিত যৌথ অভিযানে নতুন ধরনের কৌশলের সন্ধান পান গোয়েন্দারা। ডিজিএফআই ও ঢাকা কাস্টমস হাউসের অভিযানে ফলের ক্যারেটের ভেতরে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা অন্তত ১৬ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কাস্টমস।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, আমদানিকৃত পণ্যের ভেতরে এভাবে স্বর্ণ এনে পাচারের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রথম ধরা পড়েছে। তাদের ভাষ্য, এটি চোরাকারবারীদের সম্পূর্ণ নতুন কৌশল।
তদন্তে জানা গেছে, চালানটি ক্যাথে প্যাসিফিকের কার্গো ফ্লাইটে আনা হয়। রামবুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি ফলের ক্যারেটের ভেতরে বিশেষভাবে স্বর্ণ লুকানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, হংকং হয়ে এসব ফলের সঙ্গে স্বর্ণ পাঠানো হয়েছিল যাতে সহজে নজর এড়ানো যায়।
গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণ পাচারের আরেকটি নতুন রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা ফ্লাইট। এই কৌশলে দুবাই থেকে একজন যাত্রী স্বর্ণ নিয়ে বিমানে ওঠেন। পরে চট্টগ্রাম থেকে একই ফ্লাইটে চক্রের আরেক সদস্য ওঠেন। বিমানের ভেতরেই স্বর্ণ তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছে দুবাই থেকে আসা যাত্রী আন্তর্জাতিক আগমনী টার্মিনাল দিয়ে বের হয়ে যান। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে ওঠা ব্যক্তি স্বর্ণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল ব্যবহার করে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ আগমনী টার্মিনালে নিয়মিত তল্লাশি না থাকায় এই পদ্ধতিতে স্বর্ণ বের করে আনা তুলনামূলক সহজ। আগে থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে এমন যাত্রীকে শনাক্ত করাও কঠিন।
গত ২৩ জুলাই এই একই কৌশল ব্যবহার করে স্বর্ণ পাচারের সময় ৭২০ গ্রাম স্বর্ণসহ এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। গোয়েন্দাদের মতে, আগেও এ ধরনের তথ্য থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে চোরাকারবারীরা এখন এ কৌশলও ব্যবহার করছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগে দুবাই ও সৌদি আরব থেকে আসা ফ্লাইটে বিমানের ক্রু, বিমানের বিভিন্ন অংশ, লাগেজ কিংবা শরীরে বিশেষ বেল্ট ব্যবহার করে স্বর্ণ আনার ঘটনা ঘটত। এসব ক্ষেত্রে বিমানের কিছু অসাধু ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত তিন মাসে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিচালিত তিনটি বড় অভিযানে মোট ৫২ কেজির বেশি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ১২০ কোটির টাকারও বেশি।
এর মধ্যে গত ২৮ মার্চ দিবাগত রাতে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। মোট ওজন ছিল ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম। ২৪ ক্যারেটের ওই স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।
এ ঘটনার তদন্তে বাংলাদেশ বিমানের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, কয়েকজনের মোবাইল ফোনে স্বর্ণ চোরাকারবারিদের ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ওপর নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে।
এর তিন মাস পর, গত ২ জুলাই একই ধরনের আরেকটি অভিযানে বাংলাদেশ বিমানের দুবাই থেকে আসা ফ্লাইট থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায় মামলা হলেও কাউকে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি। সবশেষে ১৯ জুলাই কার্গো ভিলেজে ফলের ক্যারেটের ভেতর থেকে আরও ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রথম দুটি ঘটনার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই প্রায় সমপরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে এবং একই এয়ারলাইনস ব্যবহার করা হয়েছে। পরে কার্গোর মাধ্যমে ফলের ক্যারেটে স্বর্ণ আসার ঘটনা ধরা পড়ায় ধারণা করা হচ্ছে, আগের কৌশল নজরদারিতে চলে আসায় পাচারকারীরা নতুন পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। তাদের দাবি, প্রথম দুই ঘটনার তদন্তে বাংলাদেশ বিমানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। তবে তাদের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, তদন্তের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। খুব শিগগিরই পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। দুটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ তদন্ত করছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বিমানের কোনো সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বিমানবন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, পাচারকারীরা যেভাবে একের পর এক নতুন ফাঁকফোকর খুঁজে স্বর্ণ আনার চেষ্টা করছে, তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধরা পড়া চালানগুলো থেকে নতুন কৌশলের ধারণা মিললেও, নজর এড়িয়ে যাওয়া চালানগুলোর পরিমাণ কত, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বিমানবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী ও নেতা খায়রুল আলম ভূঁইয়া বলেন, কার্গো ব্যবহার করে স্বর্ণ পাচারের ঘটনা প্রমাণ করে যে চোরাকারবারীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে সব পর্যায়ে নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি। তার মতে, কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বিমানবন্দর ভবিষ্যতে চোরাকারবারীদের নিরাপদ রুটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হতে পারে।

