বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়ে পড়েছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কি সেই বিষয়েই কাজ করতে হবে?
আমাদের সমাজে এই প্রশ্নের উত্তর যেন আগে থেকেই নির্ধারিত: “অবশ্যই।” কেউ অর্থনীতি পড়ে সাংবাদিকতায় গেলে প্রশ্ন ওঠে, কেউ প্রকৌশল পড়ে ব্যবসায় নামলে বিস্ময় তৈরি হয়। আবার কেউ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে প্রশাসন বা করপোরেট চাকরিতে গেলে অনেকেই মনে করেন, তাঁর শিক্ষা বুঝি “অপচয়” হয়ে গেল।
কিন্তু বাস্তব জীবন কি এত সরল?
একজন তরুণ ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিষয় বেছে নেন। সেই বয়সে নিজের সক্ষমতা, আগ্রহ, শ্রমবাজার কিংবা ভবিষ্যৎ পেশা সম্পর্কে তাঁর ধারণা কতটুকুই বা পরিপক্ব? পরিবারের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা, ভর্তি পরীক্ষার ফল, চাকরির বাজার কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতেই অনেক সময় বিষয় নির্বাচন হয়। চার বছর পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে ঢুকে হয়তো তিনি বুঝতে পারেন, এই কাজ তাঁর জন্য নয়।
তাহলে কি তাঁকে অনিচ্ছার পেশায় আজীবন আটকে থাকতে হবে?
ডিগ্রি পরিচয় হতে পারে, পরিচয়ের শেষ কথা নয়
ডিগ্রি একজন মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিচয় দেয়, কিন্তু তাঁর সামগ্রিক দক্ষতা, আগ্রহ ও সম্ভাবনাকে সংজ্ঞায়িত করে না।
একজন বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থী ভালো লেখক হতে পারেন, আবার দক্ষ উদ্যোক্তাও হতে পারেন। একজন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র গবেষক হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকার, প্রশাসক কিংবা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হতে পারেন। একজন প্রকৌশলী হয়তো কয়েক বছর পর বুঝতে পারেন, তাঁর আসল দক্ষতা ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায়িক নেতৃত্বে।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানুষ শুধু একটি বিষয়ের জ্ঞান নিয়ে বের হন না। তিনি শেখেন বিশ্লেষণ করতে, সমস্যা সমাধান করতে, তথ্য যাচাই করতে, যুক্তি দাঁড় করাতে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা অর্জন করতে। ক্যারিয়ারের বাজারে এই দক্ষতাগুলোর মূল্য অনেক সময় ডিগ্রির নামের চেয়েও বেশি।
তবে “ভালো লাগছে না” বললেই ক্যারিয়ার বদল নয়*
ক্যারিয়ার পরিবর্তন স্বাধীনতার বিষয় হলেও এটি আবেগের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়। বর্তমান চাকরি ভালো লাগছে না, এটি এক ধরনের সংকেত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পরদিন চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণ অচেনা একটি পেশায় ঝাঁপ দিতে হবে।
আগে দেখতে হবে নতুন ক্ষেত্র সম্পর্কে বাস্তব ধারণা কতটা আছে। সেখানে কাজের ধরন কী, প্রয়োজনীয় দক্ষতা কী, আয় ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন, প্রতিযোগিতা কতটা এবং নিজের বর্তমান দক্ষতার কতটুকু সেখানে কাজে লাগানো যাবে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
ছোট প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ, পার্টটাইম কাজ কিংবা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা নেওয়া যেতে পারে। ক্যারিয়ার বদল মানে পুরোনো জীবনকে একদিনে ছুড়ে ফেলা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে নতুন দরজা খোলা।
রাষ্ট্রের বিনিয়োগের প্রশ্নটিও অমূলক নয়
বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর। রাষ্ট্র যখন একজন শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়, তখন সেখানে জনগণের অর্থ ও সম্পদের বিনিয়োগ থাকে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, একজন বিজ্ঞান শিক্ষার্থী যদি শেষ পর্যন্ত এমন পেশায় যান যেখানে তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান সরাসরি ব্যবহৃত হচ্ছে না, তাহলে রাষ্ট্রের সেই বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ব্যবহার হলো কি?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর উত্তর কেবল শিক্ষার্থীর ওপর দায় চাপিয়ে পাওয়া যাবে না। যদি দেশে বিজ্ঞানী, গবেষক, প্রকৌশলী বা বিশেষায়িত পেশাজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, গবেষণার সুযোগ, সম্মানজনক বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার কাঠামো না থাকে, তাহলে মেধাবী তরুণ অন্য পেশার দিকে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক।
অতএব সমস্যাটি শুধু কেন বিষয় বদলালেন” নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, “নিজের বিষয়ে থাকার মতো পরিবেশ আমরা তৈরি করেছি কি?
ক্যারিয়ার বদল মানে শূন্য থেকে শুরু করা নয়
অনেকেই মনে করেন, একবার পেশা বদলালে আগের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা সব বৃথা। বাস্তবে তা নয়।
একজন শিক্ষক পরে করপোরেট প্রশিক্ষক হলে তাঁর শেখানোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। একজন সাংবাদিক যোগাযোগ বা জনসংযোগে গেলে তাঁর গবেষণা, তথ্য যাচাই ও যোগাযোগ দক্ষতা মূল্য তৈরি করবে। একজন প্রকৌশলী ব্যবসায় গেলে তাঁর সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান নতুন উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে পারে। ক্যারিয়ার বদলালেও মানুষ অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে যান।
নতুন পথের শুরুতে হয়তো পদ ছোট হবে, আয় কমতে পারে, নতুন দক্ষতা অর্জনে সময় লাগতে পারে। কিন্তু সেটি শূন্য থেকে শুরু নয়, বরং পুরোনো অভিজ্ঞতার ওপর নতুন দক্ষতার সংযোজন।
সবচেয়ে বড় ভুল: সমাজের ভয়কে নিজের ভবিষ্যৎ বানানো
আমাদের সমাজে “মানুষ কী বলবে”, এই প্রশ্নটি অনেক তরুণের ক্যারিয়ার আটকে দেয়।
“এত কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে এখন ব্যবসা করবে?”
“আইন পড়ে সাংবাদিকতা কেন?”
“এত ভালো সাবজেক্ট ছেড়ে অন্য লাইনে গেলে?”
এসব শুনতে শুনতে একজন মানুষ এমন পেশায় আটকে যেতে পারেন, যেখানে তিনি দক্ষ হলেও সন্তুষ্ট নন। অথচ ক্যারিয়ার মূলত সেই মানুষের জীবন, যিনি প্রতিদিন কাজটি করবেন। সামাজিক প্রশংসা দিয়ে তাঁর ক্লান্তি দূর হবে না, অন্যের প্রত্যাশা দিয়ে তাঁর পেশাগত সাফল্যও নিশ্চিত হবে না।
তাই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত নিজের সক্ষমতা, আগ্রহ, বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি দরজা খুলে দেয়, দেয়াল তোলে না
শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য একজন মানুষকে নির্দিষ্ট চাকরির জন্য আটকে রাখা নয়, বরং তাঁকে শেখার, চিন্তার এবং পরিবর্তনের সক্ষমতা দেওয়া।
শ্রমবাজারও বদলাচ্ছে। নতুন নতুন পেশা তৈরি হচ্ছে, পুরোনো অনেক কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি পেশাজগতের প্রচলিত সীমানাগুলোকে ক্রমেই অস্পষ্ট করছে। এই বাস্তবতায় “তুমি যা পড়েছ, সারাজীবন তাই করবে”, এই ধারণা হয়তো আর টেকসই নয়।
তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আছে। নিজের পছন্দ বদলানোর অধিকার যেমন আছে, তেমনি নতুন ক্ষেত্রের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলার দায়িত্বও আছে।
আসল কথা
কোন বিষয়ে পড়েছি, তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই শিক্ষা দিয়ে আমি কী করতে পারছি।
ডিগ্রি একটি পথ দেখাতে পারে, কিন্তু পুরো জীবনপথ নির্ধারণ করে দিতে পারে না। ক্যারিয়ার কখনো সরলরেখায় এগোয় না। ভুল সিদ্ধান্ত, নতুন আগ্রহ, পরিবর্তিত বাস্তবতা কিংবা নতুন সুযোগ, সব মিলিয়েই তৈরি হয় কর্মজীবনের পথ।
তাই ভাবনা এমন হওয়া উচিত নয়, “আপনি যে বিষয়ে পড়েছেন, সেই বিষয়েই কেন কাজ করছেন না?”
ভাবনা হওয়া উচিত, “আপনার শিক্ষা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে আপনি শেষ পর্যন্ত কীভাবে অর্থবহ কাজে ব্যবহার করছেন?”
কারণ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু ডিগ্রির সঙ্গে চাকরির নাম মিলিয়ে ফেলা নয়, বরং নিজের সামর্থ্যকে এমন জায়গায় কাজে লাগানো, যেখানে ব্যক্তি ও সমাজ, দুজনেরই লাভ হয়।

