একই দেশ, একই আইন, একই মাসে দুটি মৃত্যুদণ্ড। একটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। অন্যটি কার্যকর হয়ে গেছে। প্রথম জন শ্রীলংকার যুবক, দ্বিতীয় দুজন বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ। প্রশ্ন একটাই, কেন একজনের পাশে তার রাষ্ট্র দাঁড়াল, আর বাকি দুজনের খবর তাদের রাষ্ট্র পেল মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়ে যাওয়ার পড়ে?
একটি ফেসবুক মন্তব্য, একটি মৃত্যুদণ্ড
অনোজন শিবারাসার বয়স ২৪। তিনি সৌদি আরবে প্রযুক্তি প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁকে ১ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে আদালত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানা করে। ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল আদালত শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ঘটনার শুরু একটি অনলাইন বিতর্ক থেকে। একটি স্ক্রিনশট তাঁর নিয়োগকর্তা ও সৌদি কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়, আর তাতেই তিনি ধরা পড়েন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি মন্তব্যের জন্য প্রাণদণ্ড, এটাই ছিল খবরের মূল ধাক্কা।
শ্রীলংকা তার নাগরিককে ছেড়ে যায়নি
শাস্তির খবর জানাজানি হতেই কলম্বো নড়েচড়ে বসে। ১৮ সেপ্টেম্বর শ্রীলংকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে জানায়, তারা কূটনৈতিক পথে বিষয়টি দেখছে। রাষ্ট্রদূত ৮ অক্টোবর কারাগারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। একটি বিশেষজ্ঞ আইনজীবী দলও সুপ্রিম কোর্টের আপিলে সহায়তা করে। প্রেসিডেন্ট পরিবারকে আশ্বাস দেন, ক্ষমা আদায়ে সরকার কোনো চেষ্টা বাকি রাখবে না। সংখ্যালঘু ছয় সংসদ সদস্যও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখে দণ্ড বাতিলের অনুরোধ করেন। আইনি লড়াই, কূটনীতি ও জনমত, তিনটিই একসঙ্গে চলেছে।
১৩ অক্টোবর সৌদি সুপ্রিম কোর্ট অনোজনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে। তবে এটাকে “মুক্তি” বলা ঠিক হবে না। তিনি এখন কারাদণ্ড ভোগ করবেন, নাকি নতুন করে বিচারের মুখোমুখি হবেন, তা স্পষ্ট নয়। আদালত কোন যুক্তিতে রায় দিল, সে বিষয়েও প্রতিবেদনে খুব কম তথ্য আছে। তাই সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রেসিডেন্টের অনুরোধে তাঁকে “মাফ” করেছে, এমন দাবির কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো মিলে নি। কিন্ত পুরো ঘটনা পর্যবেক্ষন করে দেখা যাচ্ছে যে কূটনৈতিক তৎপরতা যে তাঁর পক্ষে কাজ করেছে
মসজিদে কী ঘটেছিল, যা আজও অস্পষ্ট
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নাজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার নামে দুই বাংলাদেশিকে মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটি সৌদি সরকারের নিজের বিবৃতি, স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। শুধু মাত্র একটি ভিডিও কে কেন্দ্র করে এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে। মানবাধিকারের প্রশ্ন থেকে যাই যে শুধুমাত্র একটি মোবাইলে ধারনকৃত ভিডিও মানুষকে শূলে চড়ানোর জন্য যথেষ্ট?
বিবৃতিতে মসজিদের নাম বা গ্রেপ্তারের সময় জানানো হয়নি। অনলাইনে চুমু খাওয়ার যে কথা ছড়িয়েছে, তা অযাচাইকৃত দাবিও বলে ধারনা করা হচ্ছে। কিন্ত বিবিসি বাংলার সূত্রে দাবী করা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দুই সপ্তাহ আগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়, সে ব্যাপারে জানালেও নির্ধারিত সাজার কথা সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ মিশনকে জানায়নি।
ফাঁসির খবর কীভাবে জানলাম আমরা
এখানেই প্রশ্নটা তীক্ষ্ণ হয়। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, ফাঁসির আগে সৌদি মন্ত্রণালয় তাদের কিছু জানায়নি। ঢাকা খবরটা জেনেছে গণমাধ্যম থেকে। তবে ছবির আরেকটি অংশও আছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে প্রায় ২৫০০ বন্দীর একটি তালিকা বাংলাদেশ মিশনকে দিয়েছিল। সেই তালিকায় এই দুজনের নাম ছিল, কিন্তু তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা ছিল না। একই প্রতিবেদনে এক কর্মকর্তা জানান, দুজনের কেউই কনস্যুলার সহায়তা চেয়ে অনুরোধ করেননি। তাহলে দায় কার? সৌদি তথ্য গোপন করেছে, এটা একটা দিক। আবার প্রবাসী বন্দীদের ক্ষেত্রে নিজে এগিয়ে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা দুর্বল ছিল কি না, এটাও প্রশ্ন। নির্ধারিত সাজার কথা সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ মিশনকে না জানিয়ে কি সৌদি আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে?
কোন আইনে ফাঁসি দিলো সৌদি আরব?
প্রশ্ন আসছে সোজা উত্তর হলো, নির্দিষ্ট কোনো ধারা আমরা পাইনি, কারণ ধারা বলে কিছু নেই। সৌদি আরবে এখনো লিখিত দণ্ডবিধি নেই। বিচারকরা ইসলামি আইনের নিজস্ব ব্যাখ্যার ওপর ভর করে রায় দেন। দেশটির মূল আইন বেসিক ল অব গভর্নেন্স কুরআন ও সুন্নাহকে সংবিধান হিসেবে ধরে। সৌদি মন্ত্রণালয় বলেছে এটি তাজির শাস্তি। তাজির মানে সেই অপরাধ, যার শাস্তি শরিয়ায় নির্দিষ্ট করা নেই। ফলে বিচারক নিজের বিবেচনায় শাস্তি ঠিক করেন, এমনকি ব্যভিচারের অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন, বলছে অ্যামনেস্টি।
বিশ্ব যা বলে, সৌদি যা করে
আন্তর্জাতিক আইনে মৃত্যুদণ্ড কেবল “সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে” দেওয়া যায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির ব্যাখ্যায় এর অর্থ ইচ্ছাকৃত হত্যা। সৌদি আরব নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি আইসিসিপিআর অনুমোদন করেনি। তবে তারা আরব মানবাধিকার সনদ অনুমোদন করেছে, যার ষষ্ঠ অনুচ্ছেদেও একই সীমা আছে। সমস্যা হলো, ওই সনদ কার্যকর করার কোনো জবাবদিহি ব্যবস্থা নেই। সৌদি সরকার জাতিসংঘকে জানিয়েছে, তাদের মৃত্যুদণ্ডে আইনি সহায়তা, বাধ্যতামূলক আপিল ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনা থাকে। অথচ অনোজনের ক্ষেত্রে অ্যামনেস্টি বলছে, প্রথম দণ্ডের আগে তিনি আইনজীবী পাননি।
দূতাবাসকে না জানালে কী হয়
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব দুই দেশই কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের পক্ষ। এর ৩৬ অনুচ্ছেদ বলে, কোনো বিদেশি গ্রেপ্তার হলে তাঁর অনুরোধে দ্রুত তাঁর দূতাবাসকে জানাতে হবে এবং সহায়তার সুযোগ দিতে হবে। তবে একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। কনভেনশনে ফাঁসির আগে দূতাবাসকে সতর্ক করার সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। তাই সৌদি আরব নিয়ম ভেঙেছে কি না, এটা গ্রেপ্তারের পর কী ঘটেছিল তার ওপর নির্ভর করে। সেই তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সৌদি কি ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘন করেছে?
ভিয়েনা প্রটোকল বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ আর সৌদি আরব দুই দেশই কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের পক্ষ। ভিয়েনা প্রটোকল বিশ্লেষন করলে দেখা যায়
৩৬ অনুচ্ছেদ
প্রটোকল ৩৬ অনুচ্ছেদ এখানে মূল ভিত্তি। আটক বিদেশিকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিনা বিলম্বে জানাবে যে তিনি নিজের দূতাবাসকে জানানোর অধিকার রাখেন। তিনি চাইলে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত দূতাবাসে খবর পাঠাতে হবে এবং যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে। এই অধিকার সম্পর্কে ব্যক্তিকে জানানোর দায় আটককারী কর্তৃপক্ষের। সৌদি কর্তৃপক্ষ কি ওই দুজনকে এই অধিকারের কথা জানিয়েছিল? এর প্রমাণ এখনো প্রকাশ হয়নি।
দূতাবাসের কাজ ও সীমা
৩৬ অনুচ্ছেদে কনস্যুলার কর্মকর্তারা আটক নাগরিকের সঙ্গে দেখা করতে, কথা বলতে এবং আইনজীবী ঠিক করে দিতে পারেন। জেদ্দা কনস্যুলেট বলছে, দুজনের কেউ তাদের কাছে সহায়তা চাননি। আমরা এখানে দুটি সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে পারি। হয় তাঁরা সাহায্য চাননি। নয়তো তাঁদের জানানোই হয়নি যে সাহায্য চাওয়া যায়। দ্বিতীয়টি সত্য হলে সেটা সরাসরি ৩৬ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। মানবিক দিক বিবেচনা করে হলেও তাদের আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া উচিত ছিলো।
৩৭ অনুচ্ছেদঃ মৃত্যুর খবর জানানোর আলাদা বিধান
এখানেই সৌদি আরবের পক্ষে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা আসে। ৩৭ অনুচ্ছেদ বলে, কোনো নাগরিকের মৃত্যু হলে কর্তৃপক্ষ বিনা বিলম্বে ওই এলাকার কনস্যুলার পোস্টকে জানাবে। এই বিধান আটক ব্যক্তির অনুরোধের ওপর নির্ভর করে না। জেদ্দা কনস্যুলেট জানিয়েছে, ফাঁসির আগে তাদের কিছু জানানো হয়নি। পরে তারা নোট ভার্বাল পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চেয়েছে। এই তথ্য ঠিক হলে ৩৭ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগ বেশ জোরালো হয়।
একটি ফাঁক, যা সৌদি আরব কাজে লাগাতে পারে
কনভেনশনে ফাঁসির আগে দূতাবাসকে সতর্ক করার সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। দ্য ডিপ্লোম্যাটও এই সীমাবদ্ধতার কথা লিখেছে। তাই সৌদি আরব বলতে পারে, আগে জানানো তাদের দায় ছিল না। তবে আটক, অধিকার জানানো এবং মৃত্যুর পর জানানোর ধাপগুলো আলাদা। একটিতে ফাঁক থাকলেও বাকিগুলোতে দায় থেকে যায়।
ঢাকার দায় কোথায়?
প্রকাশিত তথ্য থেকে একটি মূল্যায়ন করা যায়। শ্রীলংকা প্রকাশ্য, সংগঠিত ও দ্রুত সাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতির খবর নেই। এশিয়া টাইমসের একটি মতামতে বলা হয়েছে, ঢাকার প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত, অথচ জনমনে ক্ষোভ ছিল প্রবল। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঘটনাটিকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা বলেছেন এবং প্রবাসীদের স্থানীয় আইন মেনে চলতে বলেছেন। এই বক্তব্যে নাগরিক হারানোর দায় স্বীকারের চেয়ে নসিহত বেশি। একটা দেশের প্রতিমন্ত্রীর নিকট তার নিজের দেশের লোকের মূল্য কতটুক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে শ্রীলংকা তার নাগরিকের জীবন রক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো
ন্যায্য কথা হলো, সৌদি তথ্য আড়াল করেছে এবং আসল ঘটনাও অস্পষ্ট। তবু রাষ্ট্রের কাজ কেবল ঘটনার পরে চিঠি লেখা নয়, আগে থেকে খোঁজ রাখাও। সেই জায়গায় ঢাকার ঘাটতি স্পষ্ট।
দুই দেশের নাগরিকই একই সৌদি আইনের মুখে পড়েছেন। তবু পরিণতি আলাদা হয়েছে। এর পেছনে আইনের চেয়েও বড় ভূমিকা রেখেছে রাষ্ট্রের আচরণ। শ্রীলংকা প্রথম থেকেই বিষয়টিকে নিজের দায় হিসেবে নিয়েছে। বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ এসেছে অনেক দেরিতে, যখন আর কিছু করার ছিল না।
প্রথম অমিল সময়ে। শ্রীলংকা মৃত্যুদণ্ডের খবর জানাজানি হওয়ার পরপরই প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা কূটনৈতিক পথে বিষয়টি দেখছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ছবিটা উল্টো। ঢাকা ফাঁসির খবর জেনেছে গণমাধ্যম থেকে, তারপর সৌদি সরকারের কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। একটি দেশ বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। অন্য দেশ ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে।

