দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ওই প্রস্তাবের ওপর বৃহস্পতিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের মতামতে উঠে আসে তীব্র বিতর্ক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ।
গ্রাহক প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ না করে দাম বাড়ানো হলে তা সরাসরি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ তৈরি করবে। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং বিদ্যুৎ খাতের ভেতরের অস্বচ্ছতা ও অপচয় বন্ধ করাই জরুরি।
শিল্প খাতের প্রতিনিধিরাও দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। স্টিলমিল মালিকদের দাবি, করোনা-পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো দুর্বল অবস্থায় আছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে স্টিল মিলসহ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চরম ক্ষতির মুখে পড়বে।
শুনানিতে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৪ হাজার ৪৮১ জন। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ১২১ জন। গরিব বা লাইফলাইন গ্রাহক, যারা শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের সংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০ জন। এই লাইফলাইন গ্রাহকদের স্বল্পমূল্যের সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, লাইফলাইন গ্রাহকদের সুবিধা বাতিল করা যাবে না। বরং ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। তার অভিযোগ, বিতরণ কোম্পানিগুলোর হিসাবে গরমিল আছে এবং তারা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোসাহিদা সুলতানা বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নয় বরং কমানোর উপায় খুঁজতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে কেন বিপুল পরিমাণ সক্ষমতা ভাড়া দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বছরে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা এ খাতে ব্যয় করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, অন্যান্য দেশের মতো চুক্তি পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে খরচ কমানো সম্ভব।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, সিস্টেম লস, দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে। এসব বন্ধ না করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত লোডশেডিং থাকলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ স্টিলমিল ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থে সাবস্টেশন তৈরি করেছে। তারপরও তাদের কাছ থেকে ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হচ্ছে, যা অযৌক্তিক। তিনি আরও বলেন, দেশের বাজেটের তুলনায় বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ সক্ষমতা ভাড়া ব্যয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেবুন্নেসা বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম বন্ধ করা গেলে বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।
শুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ঢাকা ও ঢাকা উত্তর বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি পৃথকভাবে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিটে ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধি চাওয়া হয়েছে। তবে বিইআরসির কারিগরি দল গড়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
এছাড়া আলোচনায় উঠে আসে গ্রাহক শ্রেণি পুনর্বিন্যাসের বিষয়ও। কিছু প্রস্তাবে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের লাইফলাইন সুবিধা রাখার কথা বলা হয়। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে গণ্য করার সুপারিশ আসে। অন্যদিকে কৃষি সংযোগ ব্যবহার করে ফুলচাষ, নার্সারি বা ব্যাটারি চার্জিংয়ের মতো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার বন্ধ করারও দাবি জানানো হয়।
বিইআরসির কারিগরি দলের সদস্য কামরুজ্জামান বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজকে বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। তবে কৃষি সংযোগের অপব্যবহার হলে সেটিকে আলাদা গ্রাহক শ্রেণিতে আনা যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে মাসে প্রায় দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বিল আসে। এ ধরনের অপব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, সব পক্ষের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

