বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের ‘কাঠামোগত বিভ্রান্তি’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এবং মার্কিন বিমান কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে সঠিক ছিল না।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ‘বিএনপি সরকারের ১০০ দিন—একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সমাজ গবেষণা কেন্দ্র।
রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ধারণা কাজ করছে যে যুক্তরাষ্ট্রই দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের আকার মাত্র ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার ভাষায়, বাংলাদেশের প্রকৃত বৃহত্তম বাজার হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে পণ্য আমদানির বদলে মার্কিন বিমান কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া কৌশলগতভাবে সঠিক হয়নি। এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও আপত্তি এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Boeing–এর কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সই করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গত ১ মে ঢাকায় হওয়া এই চুক্তির আওতায় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার সমান।
বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে রেহমান সোবহান বলেন, আগামী দিনের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হবে এশিয়া, বিশেষ করে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল। তাই বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারও এই অঞ্চলকে ঘিরেই নির্ধারণ করা উচিত বলে মত দেন তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েও বক্তব্য দেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, বড় পরিসরে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচিকে একীভূত করে বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, বর্তমানে মাত্র ৮ শতাংশ কর আদায়ের হার দেশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে উচ্চ আয়ের মানুষদের কাছ থেকে যথাযথ কর আদায় না হওয়াকে তিনি বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন।
ব্যাংক খাতের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঋণ খেলাপির সমস্যা শুধু আর্থিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করেনি, এটি আয় বৈষম্যও বাড়িয়ে তুলছে। তার মতে, সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ধীরে ধীরে একটি সীমিত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিশ্লেষণ দেন তিনি। রেহমান সোবহানের ভাষ্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শুরুতে মধ্যপন্থি সামাজিক গণতান্ত্রিক অবস্থানে থাকলেও পরবর্তীতে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমে’ জড়িয়ে পড়ে। একইভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর নেতৃত্বের সামাজিক পটভূমিও কর আদায় ও ঋণ খেলাপি ইস্যুতে তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ–এর সঞ্চালনায় আয়োজিত এই ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য দেন আনু মুহাম্মদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, সানেম–এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নজরুল ইসলাম।

