দেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা এবং উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতেই এই বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প ইতোমধ্যে নতুন এক ধাপে প্রবেশ করেছে। গত ৭ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি সংযোজন কার্যক্রম শুরু হয়। এখন সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি এবং নির্মাণকাজের অগ্রগতি ধরে রাখতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে আরও ৫ হাজার ৮৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। বর্তমানে চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ হাজার ১১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। নতুন প্রস্তাব অনুমোদন পেলে সেই বরাদ্দ বেড়ে প্রায় ১৫ হাজার ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ বর্তমান বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত অর্থের পুরো অংশই বৈদেশিক ঋণ সহায়তা থেকে আসবে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন না বাড়লেও রাশিয়ার ঋণের অঙ্ক বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ইতোমধ্যে অর্থ পুনর্বিন্যাসে অনাপত্তি দিয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতের থোক বরাদ্দ থেকেই এই অর্থ সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্প শুরু থেকেই রাশিয়ার ঋণনির্ভর। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়া আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঋণচুক্তির আওতায় প্রায় ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা নেওয়া হয়। সে সময় প্রতি ডলারের মূল্য ধরা হয়েছিল ৮০ টাকা। ওই হিসাবে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। তবে এক দশকে ডলারের বিনিময় হার বড় ব্যবধানে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ডলারের মূল্য ১২২ টাকা ৪০ পয়সায় পৌঁছেছে। ফলে একই ঋণের বিপরীতে এখন সরকারের দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ শুধু ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই টাকার হিসাবে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পুরো প্রকল্প ব্যয়ের ওপরও।
২০১৬ সালে অনুমোদিত মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত প্রস্তাবে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সরকারি হিসাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় ২৩ শতাংশেরও বেশি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ‘ভিভিইআর-১২০০’ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। দুই ইউনিট মিলিয়ে মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যবহৃত রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা ‘রোসাটম।

