দেশের বেসরকারি খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন শিল্পকারখানা। স্টিল মিল, তৈরি পোশাক কারখানা, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট—সবই প্রস্তুত উৎপাদনের জন্য কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এসব কারখানার বড় অংশই পড়ে আছে অচল অবস্থায়।
বিনিয়োগ হয়েছে, ভবন তৈরি হয়েছে, যন্ত্রপাতিও বসানো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন শুরু হয়নি। ফলে আটকে আছে বিপুল পুঁজি, বিলম্বিত হচ্ছে কর্মসংস্থান, আর চাপ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের ওপর। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বর্তমানে বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প এলাকায় গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় অচল অবস্থায় রয়েছে। তবে প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। শুধু জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছেই প্রায় ১ হাজার ৮০০টি গ্যাস সংযোগ আবেদন ঝুলে আছে।
বিনিয়োগের বড় অংশই এখন অচল সম্পদ: দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু উৎপাদন না থাকায় এসব বিনিয়োগ এখন উদ্যোক্তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- সিটি গ্রুপের মুন্সিগঞ্জের হোসেনদি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হলেও ছয়টি বড় কারখানা এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি
- মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ
- কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তুত
- আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা
- নিতল-নিলয় গ্রুপ কিশোরগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৬০০ কোটি টাকা
- বাশুন্ধরা গ্রুপ বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা
- বায় গ্রুপের অর্থনৈতিক অঞ্চলেও শত শত কোটি টাকার পরিকল্পনা
এসব প্রকল্পের অধিকাংশই নির্মাণ শেষ বা শেষ পর্যায়ে। কিন্তু গ্যাস না থাকায় উৎপাদন শুরু হয়নি। ফলে উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করছেন, অথচ কোনো আয় আসছে না। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে।
সিটি গ্রুপ: উৎপাদন না হলেও ঋণের চাপ:
সিটি গ্রুপ মুন্সিগঞ্জে যে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছে, সেখানে ছয়টি শিল্প ইউনিট এখনো গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বিনিয়োগ কার্যত অলস অবস্থায় পড়ে আছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কারখানাগুলোও গ্যাসের কম চাপের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। ডলারের মূল্য বৃদ্ধিও তাদের আর্থিক ক্ষতি বাড়িয়েছে।
সূত্র বলছে, কোম্পানিটি ঋণের চাপ সামাল দিতে কিছু ব্যবসা বিক্রির চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরযোগ্য ঋণ পরিশোধ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এখন নগদ প্রবাহ সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মেঘনা গ্রুপ: বারবার আবেদনেও সমাধান নেই
২০১৫ সালে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলেও গ্যাস সংকটে বহু কারখানা এখনো চালু হয়নি। সেখানে দেশি-বিদেশি অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। ২০২২ সালে কুমিল্লায় আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হয়। সেখানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। ভবিষ্যতে মোট বিনিয়োগ ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু ২০২২ সাল থেকে একাধিক দপ্তরে আবেদন করেও গ্যাস সংযোগ পাওয়া যায়নি। বারবার বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জানান, স্টিল ও অন্যান্য শিল্পে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হলেও প্রতি বছর বড় অঙ্কের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের কোনো নির্দিষ্ট সময়ও জানানো হয়নি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে আবদুল মোনেম গ্রুপের অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন অচল অবস্থায়। শুধুমাত্র একটি হোন্ডা কারখানা উৎপাদনে আছে, বাকি সবই বন্ধ। নিতল-নিলয় গ্রুপ কিশোরগঞ্জে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বড় বিনিয়োগ করলেও গ্যাস না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। এতে আর্থিক চাপ বাড়ছে প্রতিষ্ঠানটির ওপর।
নারায়ণগঞ্জে বসুন্ধরা গ্রুপের বীজ ও সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ২০২২ সাল থেকে উৎপাদনের অপেক্ষায়। ঋণ নিয়েও উৎপাদন শুরু হয়নি। একইভাবে চট্টগ্রামে টিকে গ্রুপের স্টিল মিল ২০২২ সাল থেকে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় অচল। পাশাপাশি পুরোনো জুট মিল ও নতুন রাসায়নিক প্রকল্পও গ্যাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
সরকার ২০১১ সালে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা নিলেও গ্যাস সংকটে অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি অঞ্চলে আংশিক গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলই সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলেও গ্যাস ও পানির অভাবে পূর্ণ বিনিয়োগ হয়নি। জামালপুর, সিরাজগঞ্জসহ অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চলেও একই পরিস্থিতি। অবকাঠামো থাকলেও প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি না থাকায় উৎপাদন শুরু হয়নি।
কেন গ্যাসের ওপর এত নির্ভরতা:
বাংলাদেশের শিল্পখাত দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এটি তুলনামূলক সস্তা ও স্থিতিশীল জ্বালানি উৎস হওয়ায় কারখানার প্রধান শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাপ উৎপাদন ও বিদ্যুৎ—দুই ক্ষেত্রেই গ্যাস ব্যবহৃত হয়। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করা গেলেও খরচ কয়েকগুণ বেশি, যা শিল্পের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়। গ্যাসের দাম বাড়লেও এটি এখনো তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি।
সংকটের মূল কারণ:
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে ২ দশমিক ৬ থেকে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট। ফলে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির কারণে শুধু শিল্প নয়, বিদ্যুৎ ও সার কারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৮০০টি গ্যাস সংযোগ আবেদন এখনো ঝুলে আছে। এর মধ্যে বহু প্রতিষ্ঠান চার থেকে পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষায়। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নতুন পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সংকট সমাধান করা হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সমাধান না হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয়ই বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
দেশে শিল্পায়নের বড় অগ্রযাত্রা শুরু হলেও গ্যাস সংকট এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। কারখানা প্রস্তুত, কিন্তু জ্বালানি না থাকায় উৎপাদন শুরু হচ্ছে না। ফলে একদিকে উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে, অন্যদিকে অর্থনীতির সম্ভাবনাও আটকে আছে অব্যবহৃত অবকাঠামোর ভেতরে।

