বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে (১৩ মে) একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু চাঞ্চল্যকর বিবৃতি জারি করে বলা হয় যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী “গোপনে” সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন এবং রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাকে তারা একটি “ঐতিহাসিক অগ্রগতি” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কয়েক ঘণ্টা পর, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্বাভাবিক কঠোরতার সঙ্গে এর প্রতিবাদ জানায়। তারা প্রতিবেদনটিকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” আখ্যা দিয়ে বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যে, ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির অধীনে আমিরাত-ইসরায়েল সম্পর্ক প্রকাশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। জানা গেছে, এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় আমিরাতিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো দ্রুতই শূন্যস্থান পূরণ করে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’ আবুধাবিকে আরও বিব্রত করতে এবং তাদের অস্বীকারকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সেই গোপন সফরের সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করে।
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, বৈঠকটি ২৬ মার্চ ওমান সীমান্তের কাছে মরূদ্যান শহর আল-আইনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছিল। এতে আরও বলা হয়েছে যে, “এমবিজেড তার ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নেতানিয়াহুকে বিমান থেকে প্রাসাদে নিয়ে গিয়েছিলেন”।
কিছু প্ল্যাটফর্ম দাবি করেছে যে, ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী সেদিন ইসরায়েলি-সংশ্লিষ্ট দুটি বোম্বার্ডিয়ার বিজনেস জেট তেল আবিব থেকে আল-আইনে গিয়েছিল। নেতানিয়াহুর সাবেক চিফ অব স্টাফ জিভ আগমন ফেসবুকে খোলাখুলিভাবে লিখেছেন যে, তিনি তার বসের সঙ্গে ছিলেন, এই সফরটি “আজ পর্যন্ত অত্যন্ত গোপন” ছিল এবং শেখ মোহাম্মদ ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুকে বিমানবন্দর থেকে প্রাসাদে নিয়ে গিয়েছিলেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে, মোসাদ প্রধান ডেভিড বারনিয়া যুদ্ধ চলাকালীন অন্তত দুবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভ্রমণ করেছিলেন।
অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে যে, শিন বেতের পরিচালক ডেভিড জিনিও সফর করেছিলেন এবং আলাদাভাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াল জামিরও এই সফরে গিয়েছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিসহ মার্কিন কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছেন যে, ইসরায়েল আমিরাতের মাটিতে আয়রন ডোম ব্যাটারি পরিচালনার জন্য ইসরায়েলি সৈন্য মোতায়েন করেছে।
এই মুহূর্তে দুটি বিষয় স্পষ্ট: নেতানিয়াহু সফর করেছিলেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তা অস্বীকার করেছে।
প্রশ্নটা এটা নয় যে, নেতানিয়াহু কেন আবুধাবি সফর করেছিলেন, বরং প্রশ্ন হলো কেন তার দপ্তর তথ্যটি ফাঁস করল এবং কেন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অসৎ হিসেবে চিত্রিত করার ওপর এত জোর দেওয়া হচ্ছে।
আবুধাবি কেন এই সফর প্রত্যাখ্যান করল, বিশেষ করে যখন তাদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আব্রাহাম চুক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়? এবং এই প্রকাশ্য বিরোধ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?
নেতানিয়াহুর হিসাব
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদ, যার পরিচিতি দুর্নীতির অভিযোগ, আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং স্বৈরাচারী প্রবণতার জন্য।
এই বছরের শেষের দিকে তাকে একটি নির্বাচন, একটি চলমান দুর্নীতির মামলা এবং গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তার পক্ষে সম্ভাব্য প্রতিটি জয়ই প্রয়োজন—বিশেষ করে এমন একটি জয়, যা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে থাকা ব্যক্তির পরিবর্তে আরব রাজধানীতে সমাদৃত একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের ঘোষণাটি ঠিক সেই উদ্দেশ্যই পূরণ করে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলি জনগণকে জানানো হয় যে, গাজা যুদ্ধের পরেও আব্রাহাম চুক্তি টিকে গেছে।
এটি আরও ইঙ্গিত দেয় যে, আঞ্চলিক সংঘাতের সময় ইরান ইসরায়েলকে একঘরে করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে এখনও এই অঞ্চলে চুক্তি সম্পন্ন করতে পারেন। অন্য কথায়, তিনি অভ্যন্তরীণ লাভের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনাকে কাজে লাগিয়েছেন—এমন একটি ঘটনা, যার রাজনৈতিক গুরুত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে অনেক কম বলে মনে হয়।
এর আরও কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। এই সফরকে জনসমক্ষে এনে নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তাদের সহযোগিতার বৃহত্তর স্বীকৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যে বিষয়টি আবুধাবি গোপন রাখতে পছন্দ করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত যদি শেষ পর্যন্ত বর্তমানে যা অস্বীকার করছে তা নিশ্চিত করে, তবে সেই নিশ্চিতকরণটি নেতানিয়াহুর উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে উঠবে। আর যদি তারা তা না করে, তবুও এই ফাঁস হওয়া তথ্যটি তার কাঙ্ক্ষিত শিরোনাম তৈরি করবে। প্রতিটি পরিস্থিতিতেই নেতানিয়াহু লাভবান হবেন; প্রতিটি পরিস্থিতিতেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশের বাইরেও ইরানের প্রতি একটি বার্তা রয়েছে: ইসরায়েল একটি উত্তপ্ত সংঘাতের সময় তার প্রধানমন্ত্রী, গোয়েন্দা প্রধান এবং সামরিক প্রধানকে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠাতে সক্ষম। এই সক্ষমতা নিজেই একটি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের, বিশেষ করে জিসিসির মধ্যে, বিভেদ আরও গভীর করার ইসরায়েলি আকাঙ্ক্ষা। ইসরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আবুধাবিকে প্রকাশ্যে জড়িয়ে নেতানিয়াহু একটি ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ কৌশল এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন—যা একদিকে আঞ্চলিক বিভাজনকে আরও গভীর করছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সমন্বয়ের ওপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের নির্ভরশীলতাকে আরও জোরদার করছে।
এই পর্যায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমন কিছুর প্রয়োজন নেই এবং তারা স্বেচ্ছায় তা আমন্ত্রণও জানাবে না।
আবুধাবির উভয়সংকট
আবুধাবির এই অস্বীকার আসলে বৈঠকটি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নয়। বরং এটি স্বীকার করার পরিণতি নিয়ে। চারটি চাপ আমিরাতিদের সরাসরি প্রত্যাখ্যানের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
প্রথমটি হলো আঞ্চলিক জনমত। গাজা গণহত্যার স্মৃতি এখনও জীবন্ত থাকায়, প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে আতিথ্য দিলে তা আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনগণকে উত্তেজিত করবে এবং এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অভ্যন্তরীণভাবে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সহনশীলতা ও সহাবস্থানকে আনুষ্ঠানিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রচারে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সেই ভাষা এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে যুদ্ধকালীন জোটবদ্ধতার মধ্যে ব্যবধান এতটাই বিশাল যে, তা এক নীরব অভ্যন্তরীণ অস্বস্তিকে উস্কে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, এই তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি আবুধাবির একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে: একদিকে ২০২১ সালে উপসাগরীয় সংকটের সমাধানের পর তুরস্ক ও কাতারের মতো দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অন্যদিকে ২০২৩-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে থেকেই, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন, সোমালিয়া, সুদান এবং লিবিয়ায় নিজেদের অনুমিত ভূমিকা নিয়ে সৃষ্ট আঞ্চলিক ক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল—এই ক্ষেত্রগুলোতে আবুধাবিকে ব্যাপকভাবে ইসরায়েলের প্রক্সি হিসেবে দেখা হতো। নেতানিয়াহুর ফাঁস করা তথ্য সেই ক্ষোভ সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টাকে সরাসরি দুর্বল করে দিয়েছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আরও বেশি অরক্ষিত ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
তৃতীয়ত, ইরানের হামলা অন্য যেকোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রের চেয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বেশি আঘাত হেনেছিল। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, যুদ্ধ চলাকালীন ইরান দেশটির দিকে ৫৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২,২০০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধকালীন গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়টি প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হলে, তা জিসিসির সম্পৃক্ততা নিয়ে ইরানের বয়ানকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয় এবং তেহরানের কট্টরপন্থীদের চোখে এমন নতুন দফা হামলার ন্যায্যতা দিতে পারে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষে সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
চতুর্থত, আমিরাতের ব্যবসায়িক মডেল। সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে পুঁজি, প্রতিভা এবং পর্যটনের একটি স্থিতিশীল কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা সেই ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর এবং এটি সেইসব বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করবে, যারা বিশ্বাস করতে চান যে দেশটি চিরস্থায়ী হুমকির মধ্যে নেই।
এর সঙ্গে প্রোটোকলেরও একটি বিষয় জড়িত। আমিরাতের কর্তৃপক্ষ আকস্মিক কোনো ঘটনা পছন্দ করে না। নেতানিয়াহুর একতরফা প্রকাশ গোপন কূটনীতির মৌলিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে এবং আবুধাবিতে এটিকে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হয়েছে। এই অস্বীকার আংশিকভাবে এই ইঙ্গিত দেয় যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইসরায়েলি নির্বাচনী প্রচারণার একটি হাতিয়ারে পরিণত করা হবে না।
এই অর্থে, নেতানিয়াহুর তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর বাস্তব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আর্থিক এবং নিরাপত্তাগত প্রভাব ফেলে।
কিন্তু এমন ঘটনা নজিরবিহীন নয়। ২০২০ সালের শেষের দিকে, নেতানিয়াহু সৌদি আরবের মেগাসিটি নিওম সফরের খবর ফাঁস করে দেন—যে পদক্ষেপটি মারাত্মকভাবে হিতে বিপরীত হয়েছিল। রিয়াদ এই কৌশলটির আসল রূপ বুঝতে পেরেছিল, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের নীতি থেকে সরে এসেছিল এবং নিজেদের অবস্থান এমনভাবে কঠোর করেছিল, যার রেশ আজও রয়ে গেছে।
নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক তথ্য ফাঁস স্বাভাবিকীকরণ স্থগিত রাখার ব্যাপারে সৌদি আরবের সিদ্ধান্তকে আরও জোরদার করতে পারে। এর ফলে আবুধাবিতেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে কিনা, তা অন্য প্রশ্ন—ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততা রিয়াদের চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং প্রাতিষ্ঠানিক।
কিন্তু এমনকি আবুধাবিতেও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন যে, এই সম্পর্কের জন্য যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না: এটি কি আমিরাতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করছে এবং দেশটিকে এমন সংঘাত ও বিচ্ছিন্নতার গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে?
- আলী বাকির: ইবন খালদুন মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান কেন্দ্রের একজন গবেষণা সহকারী অধ্যাপক। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

