তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Makkah Joint Defence Agreement) ঘোষণার পর থেকেই এটিকে অনেকেই মুসলিম বিশ্বের একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা হিসেবে দেখছেন। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা হবে।
কিন্তু ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের হামলার মুখে সৌদি আরবের পাশে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ না আসায় প্রশ্ন উঠেছে, এই চুক্তি কি বাস্তব সংকটে কার্যকর হবে, নাকি এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঘোষণা মাত্র?
তবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, মক্কা চুক্তি এখনো ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে পরিণত হয়নি। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রতিক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা এই চুক্তিতে নেই। অর্থাৎ কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই অন্য দুই দেশকে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ শুরু করতে হবে – এমন কোনো ব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং চুক্তির লক্ষ্য হলো প্রতিরোধ ক্ষমতা (collective deterrence), সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা।
এদিকে, সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান জানিয়েছেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ইসলামি বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার উদ্যোগ। প্রশ্ন উঠছে, একে অপরের ওপর হামলার ক্ষেত্রে পাশে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তাই যদি না থাকে, তাহলে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান কোন ‘গুরুত্বপূর্ণ বার্তা’র কথা বলছেন?

কেন তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে নামছে না?
এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে প্রথম কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সমন্বয় কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। অর্থাৎ জোটটি এখনো কার্যকর কমান্ড কাঠামো, যৌথ পরিকল্পনা ও সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের নিজস্ব কৌশলগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পাকিস্তানের সৌদির সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। তবে ইসলামাবাদ সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। বিশেষ করে ইয়েমেন যুদ্ধের সময় ২০১৫ সালেও পাকিস্তান সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে সরাসরি সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ পাকিস্তানের সামনে একদিকে সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, অন্যদিকে ইরানসহ আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তৃতীয়ত, তুরস্কও সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে সতর্ক।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হলেও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংঘাতে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ করে না। আঙ্কারা সাধারণত নিজের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রভাব এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ মানে ইয়েমেন সংকটে নতুন একটি পক্ষ হিসেবে প্রবেশ করা, যা তুরস্কের জন্য বড় কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাহলে কি মক্কা চুক্তি ব্যর্থ?
এখনই এটিকে ব্যর্থ বলা রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত হবে। কারণ একটি প্রতিরক্ষা জোট কার্যকর হতে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন—
- যৌথ কমান্ড কাঠামো
- নিয়মিত সামরিক মহড়া
- গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়
- অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা
- সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া
মক্কা চুক্তির বর্তমান পর্যায়ে এসব কাঠামো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। তিন দেশ জানিয়েছে, তারা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামরিক সহযোগিতা এবং যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে জোটকে শক্তিশালী করতে চায়।
হুথি হামলা কেন বড় পরীক্ষা?
হুথিদের সক্ষমতা শুধু সামরিক নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। ইয়েমেনের এই গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের সীমান্ত এলাকা, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করেছে। ফলে সৌদির জন্য সমস্যা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়; এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নও।
যদি মক্কা চুক্তি বাস্তব প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তবে প্রথম বড় পরীক্ষা হবে- সদস্য দেশগুলো সংকটের সময় কত দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং কতটা বাস্তব সামরিক সহযোগিতা দেখাতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রত্যাশা ও বাস্তবতার পার্থক্য। ঘোষণার সময় এটিকে অনেকে মুসলিম বিশ্বের একটি সম্ভাব্য “ন্যাটো-ধাঁচের” জোট হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এটি এখনো একটি প্রাথমিক নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব, যার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তব সামরিক সমন্বয়ের ওপর।
সৌদি আরব চায় এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেখানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। পাকিস্তান চায় সৌদি ও তুরস্কের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য ধরে রাখতে। তুরস্ক চায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে, তবে সরাসরি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না।
তাই হুথিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়া না আসা মক্কা চুক্তির তাৎক্ষণিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছে, কিন্তু এটি প্রমাণ করে না যে চুক্তি সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বরং এটি দেখিয়েছে – একটি রাজনৈতিক ঘোষণা থেকে কার্যকর প্রতিরক্ষা জোটে পরিণত হতে সময়, কাঠামো এবং বাস্তব প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
মূল প্রশ্ন হলো: হুথিদের মতো অপ্রচলিত যুদ্ধে (asymmetric warfare) যদি সৌদি আরব বারবার চাপের মুখে পড়ে, তাহলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কি শুধু কূটনৈতিক প্রতীক হয়ে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে সত্যিকারের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে?

