আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও কমেছে সোনার দাম। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) স্পট গোল্ডের দাম দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি ট্রয় আউন্স ৪ হাজার ২৬৬ দশমিক ৪৯ ডলারে নেমেছে। এর ফলে প্রায় এক মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর আগের দিনও সোনার বাজারে বড় দরপতন দেখা যায়। সোমবারের লেনদেনে সোনার দাম ৭ আগস্টের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছিল। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে মূল্যবান এই ধাতুটির বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
মার্কিন বাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সোনার ভবিষ্যৎ লেনদেনের দাম ১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩০৭ দশমিক ৪০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সোনার দামের এই পতনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এই দুই বিষয়ই বিনিয়োগকারীদের সোনার প্রতি আগ্রহে প্রভাব ফেলছে।
ফেডের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে বাজার
বর্তমানে বিশ্ববাজারের নজর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের দিকে। দুই দিনের বৈঠক শেষে আগামী বুধবার সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে প্রতিষ্ঠানটি।
বাজারে এখন ধারণা তৈরি হয়েছে, ফেড ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট সুদের হার বাড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে নীতিগত সুদের হার ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে পৌঁছাতে পারে।
সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনাই সোনার বাজারে চাপ তৈরির অন্যতম কারণ। কারণ সোনা থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না। বিপরীতে ব্যাংক আমানত, সরকারি ঋণপত্র বা অন্যান্য সুদবাহী সম্পদে বিনিয়োগ করলে নির্দিষ্ট হারে আয় পাওয়ার সুযোগ থাকে।
ফলে সুদের হার যখন বাড়ে, তখন সোনা হাতে রাখার সুযোগব্যয়ও বেড়ে যায়। অর্থাৎ একই অর্থ সোনায় বিনিয়োগ না করে সুদ পাওয়া যায় এমন সম্পদে রাখলে বিনিয়োগকারীর সম্ভাব্য আয় বেশি হতে পারে। এ কারণে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে অনেক বিনিয়োগকারী সোনা থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
বর্তমান বাজারে ঠিক এই প্রত্যাশাই সোনার দামের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির চাপও বড় বিষয়
শুধু সুদের হার নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক তথ্যও সোনার বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্য বেড়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল সূচকও চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মূল্যস্ফীতি যদি প্রত্যাশার তুলনায় বেশি সময় ধরে চাপে থাকে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ধরে রাখতে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সোনার আকর্ষণ কিছুটা কমে যেতে পারে। কারণ সোনা কোনো সুদ দেয় না, অথচ সুদবাহী সম্পদে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীরা নিয়মিত সুদ পাওয়ার সুযোগ পান।
তবে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সোনার চাহিদা বাড়াতেও পারে। তাই বর্তমান দরপতনকে শুধু সোনার বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফেডের সিদ্ধান্ত, মূল্যস্ফীতির গতিপথ এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি আগামী দিনে সোনার দামের দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
তেলের দামও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন থেকে উৎপাদন—অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামের ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে তেলের দাম এবং মূল্যস্ফীতির সম্পর্কও বর্তমানে সোনার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদি জ্বালানির উচ্চ দাম মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে, তাহলে ফেডের সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে সুদের হার কমার সম্ভাবনা কমে গেলে সোনার বাজারে স্বল্পমেয়াদে চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও পতন
শুধু সোনাই নয়, মঙ্গলবার অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে।
রুপার দাম দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬২ দশমিক ৮০ ডলারে নেমেছে। প্ল্যাটিনামের দাম ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪২ দশমিক ৭৪ ডলারে।
প্যালাডিয়ামের দামও ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। লেনদেন শেষে প্রতি আউন্স প্যালাডিয়ামের দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮২ দশমিক ৭৯ ডলার।
অর্থাৎ মূল্যবান ধাতুর বাজারে সামগ্রিকভাবেই কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের বাজারে দাম এখনো বেশ উঁচু
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে সোনার দাম এখনো বেশ উঁচু পর্যায়ে রয়েছে।
দেশের বাজারে ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি অর্থাৎ ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম সোনার দাম বর্তমানে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা।
২১ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা। আর ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক দরপতন বাংলাদেশের ক্রেতাদের জন্য কতটা স্বস্তি আনবে, সেটি নির্ভর করবে দেশের বাজারে দাম নির্ধারণের সময় আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন কতটা প্রতিফলিত হয় তার ওপর।
বিশ্ববাজারে সোনার দাম এখন এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকলেও সামনে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের সিদ্ধান্তই বড় পরীক্ষার বিষয়। সুদের হার বাড়ানোর ইঙ্গিত এলে সোনার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে সুদের বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিলে মূল্যবান এই ধাতুটির বাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
তাই আগামী কয়েক দিনের বাজারে ফেডের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি, তেলের দাম এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাই সোনার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

