বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের জন্য সরকারের প্রস্তাবিত ‘মডেল চাকরি প্রবিধানমালা’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে থাকা কোম্পানি, ব্যাংক-বিমা, আইটি, এনজিও এবং সেবা খাতের লাখো বেতনভুক্ত কর্মচারীদের জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করার উদ্যোগটি স্বাগত জানালেও, খসড়ার কিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিধিমালা কি সত্যিই কর্মচারীদের সুরক্ষা বাড়াবে, নাকি বিদ্যমান সুবিধাগুলোকে একটি সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে আটকে দিয়ে ক্ষতির মুখে ফেলবে?
কেন এই উদ্যোগ, কারা বাদ পড়ছেন
বাংলাদেশের শ্রম আইন মূলত ‘শ্রমিক’দের রক্ষা করে, যাদের সংজ্ঞা শ্রম আইনের ২(৬৫) ধারায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লাখো বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এই সংজ্ঞার বাইরে। তাদের চাকরির নিরাপত্তা, বকেয়া পাওনা, ছুটি কিংবা অভিযোগের প্রতিকার নির্ভর করে শুধু একটি নিয়োগপত্র আর সাধারণ চুক্তি আইনের ওপর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে কর্মরত প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেসরকারি খাতে কাজ করেন, যেখানে সরকারি খাতে নিয়োজিত মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এই বিশাল কর্মীবাহিনীকে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যেই নতুন বিধিমালার উদ্যোগ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬’ ও ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫’-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
যা আছে খসড়ায়, যা নিয়ে প্রশ্ন
খসড়াটিতে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন লিখিত নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক করা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিধান, শাস্তির আগে তদন্ত ও শুনানির সুযোগ, যৌন হয়রানির বিস্তারিত কাঠামো, ১২০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কালো তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে রয়েছে বড় ফাঁকও। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি একটি ‘মডেল’ বিধিমালা, যা বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশিকামাত্র। মানলে ভালো, না মানলে কোনো জবাবদিহি নেই। খসড়ায় অতিরিক্ত সময়ের কাজের বাড়তি মজুরির কোনো স্পষ্ট বিধান নেই, অথচ শ্রম আইনে শ্রমিকরা ওভারটাইমে দ্বিগুণ মজুরি পান। পিতৃত্বকালীন ছুটির উল্লেখই নেই। উৎসব বোনাসকে ‘সর্বোচ্চ এক মাস’ বলে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা সুরক্ষার নামে সীমা তৈরি করেছে। কর্মঘণ্টার পর ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট’, তথ্য ও নজরদারির সীমা নিয়ে খসড়া প্রায় নীরব। আর সবচেয়ে বড় ফাঁক হলো—কে ‘কর্মচারী’ আর কে ‘কর্মকর্তা’, তার স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় সবাইকে ‘কর্মকর্তা’ বা ‘কনসালট্যান্ট’ তকমা দিয়ে সুরক্ষার বাইরে রাখা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের তিন মানদণ্ড ও সুপারিশ
নীতিমালাবিষয়ক লেখক সুবাইল বিন আলম এই খসড়াকে তিনটি সরল মানদণ্ডে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন; ন্যূনতম অধিকার বাধ্যতামূলক হতে হবে, মালিকের খেয়ালখুশির সীমা টানতে হবে এবং প্রতিটি অধিকারের বিপরীতে একটি কার্যকর প্রতিকার থাকতে হবে। এই কষ্টিপাথরে যাচাই করে তিনি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিয়েছেন। তার মতে, এটিকে ‘মডেল’ নয়, প্রজ্ঞাপন আকারে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মান হিসেবে জারি করতে হবে। ‘কর্মচারী’ ও ‘কর্মকর্তা’র সংজ্ঞা হবে পদবি নয়, প্রকৃত কাজভিত্তিক; বিতর্ক হলে প্রমাণের দায় মালিকের। বারবার নবায়ন হওয়া চুক্তি নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী গণ্য হবে, যাতে ‘কনসালট্যান্ট’ তকমায় সুরক্ষা ফাঁকি বন্ধ হয়। বেতন ও আর্থিক সুরক্ষায় ওভারটাইমে দ্বিগুণ মজুরি, মূল বেতন যেন মোট বেতনের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ হয়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ন্যূনতম হার এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়, নববর্ষ ভাতা ও দুটি উৎসব বোনাস ‘সর্বোচ্চ’ নয় ‘ন্যূনতম’ ভাষায়, মুনাফায় অংশগ্রহণ (৫ শতাংশ তহবিল) সব স্তরের কর্মীর জন্য এবং চাকরি অবসানে সব পাওনা ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধের সুপারিশ রয়েছে।
ছুটি, নিরাপত্তা ও চাকরির নিরাপত্তায় যা দরকার
ছুটি ও পরিবার-বান্ধব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সুবাইল বিন আলম সপ্তাহে দুই দিন ছুটি, জমা ছুটির নগদায়ন, অন্তত ১৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি, ১০০+ কর্মীর প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার এবং নারীর রাত্রিকালীন শিফটে নিরাপদ পরিবহনের সুপারিশ করেছেন। সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ভবিষ্য তহবিলের সীমা কমিয়ে (২০ থেকে ৫০ কর্মী) পোর্টেবল করা, গোষ্ঠী স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক, ১০০+ প্রতিষ্ঠানে গোষ্ঠী জীবন ও দুর্ঘটনা বিমা এবং নিরাপত্তা কমিটি গঠনের কথা বলেছেন। চাকরির নিরাপত্তা ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে কারণসহ, লিখিত ও যাচাইযোগ্য চাকরিচ্যুতি, হয়রানি কমিটিতে বাইরের সদস্য, বৈষম্যের পূর্ণ তালিকা এবং সরাসরি শ্রম আদালতের আগে একটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির ধাপের সুপারিশ করেছেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করেছেন, কর্মচারীবান্ধব মানে মালিকবিরোধী নয়। প্রতিষ্ঠানেরও কর্মদক্ষতা ব্যবস্থাপনা, প্রমাণভিত্তিক শৃঙ্খলা এবং প্রয়োজনে পুনর্গঠনের বৈধ অধিকার আছে, কিন্তু প্রতিটি অধিকারের পাশে থাকতে হবে প্রক্রিয়া, প্রমাণ, সমানুপাতিকতা আর আপিলের সুযোগ।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক যুক্তি
এই বিধিমালার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও রয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশ আইএলওর ১৫৫ (পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য), ১৮৭ (পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের প্রচারমূলক কাঠামো) এবং ১৯০ (কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি) নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে আইএলওর দশটি মৌলিক কনভেনশন অনুসমর্থনকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি+ সুবিধা শ্রম ও মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের যাচাই এখন সরাসরি নির্ভর করছে শ্রম মানের ওপর। কর্মচারীর সুরক্ষা তাই কেবল সামাজিক ন্যায় নয়, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা-সক্ষমতারও শর্ত। গবেষণায় প্রমাণিত যে সুখী কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানও ভালো চলে। লেখক তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, বিদেশি কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার সময় অনেক সুযোগ পাওয়া যায়নি, কারণ আইনে তা লেখা ছিল না।
প্রক্রিয়াগত অনুরোধ ও সামনের পথ
সবশেষে একটি প্রক্রিয়াগত অনুরোধ রেখেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, এই খসড়া যেন কেবল মালিকপক্ষের মতামতে চূড়ান্ত না হয়। কর্মচারী প্রতিনিধি, মানবসম্পদ পেশাজীবী, সুশীল সমাজ ও গবেষকদের টেবিলে রাখতে হবে। নাহলে এটি এক পক্ষের প্রবিধান হয়ে থাকবে এবং তখন সংবাদপত্রের প্রশ্নটাই সত্য হয়ে দাঁড়াবে, সুরক্ষা, না সুবিধা ছাঁটাই? তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তটি বিরল। এক প্রজন্মে একবারই বেসরকারি কর্মজীবীর জন্য একটি ন্যায্য সনদ লেখার সুযোগ আসে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের জন্য একটি বাধ্যতামূলক, কার্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

