গত কয়েক দিনে কয়েকটি জেলায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের যে সংখ্যা এসেছে, তা থমকে দাঁড়ানোর মতো। সমকালের ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ জেলায় আটক হয়েছেন ১ হাজার ৬৪৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৪৪৫, কুমিল্লায় ৪১৫, চাঁদপুরে ৩৭০, লক্ষ্মীপুরে ২৪৪ ও নোয়াখালীতে ১৭১ জন। শুধু কুমিল্লায় তিন দিনে আটক হয়েছেন ১ হাজার ২৯৩ জন। তাদের ৬১৯ জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে, আর ৬৭৪ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছাত্র। কিশোর গ্যাং যে বাস্তব সমস্যা, তা নিয়ে তর্ক নেই। তবু একটা প্রশ্ন আমাকে ভাবাচ্ছে, আপনাকেও হয়তো ভাবাচ্ছে: ধরপাকড়ে গ্যাং ভাঙে ঠিকই, কিন্তু কিশোররা কেন বারবার সেই পথেই হাঁটে? এই লেখায় আমি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব, আর তার জন্য একটু দূরে, উত্তর আটলান্টিকের একটি ছোট দেশে ঘুরে আসব।
ইউরোপের সবচেয়ে বখে যাওয়া কিশোরেরা যেভাবে বদলে গেল
আইসল্যান্ডের কথা ভাবুন। ১৯৯৮ সালে সেখানে ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিদিন ধূমপান করত, ৪২ শতাংশ আগের এক মাসে অন্তত একবার মাতাল হয়েছিল, আর ১৭ শতাংশের বেশি অন্তত একবার হাশিশ (গাঁজা) ব্যবহার করেছিল। এই তথ্য একটি পিয়ার রিভিউড গবেষণার। স্কুলে নেশার ক্ষতি নিয়ে পাঠ দিয়েও কাজ হচ্ছিল না। তখন সেখানে “ইয়ুথ ইন আইসল্যান্ড” নামের একটি কর্মসূচি শুরু হয়, যার মূল কথা ছিল কিশোরদের হাতে অন্য কিছু করার সুযোগ ও বাড়িতে বড়দের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য রাত ১০টা (শীতে) ও মধ্যরাত (গ্রীষ্মে) পর্যন্ত বাইরে থাকার সীমা ঠিক করা হয়। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যেসব কিশোর প্রায়ই বা প্রায় সব সময় সপ্তাহের দিনগুলোয় বাবা মায়ের সঙ্গে সময় কাটাত, তাদের হার ২৩ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশ হয়েছে। সপ্তাহে অন্তত চারবার সংগঠিত খেলাধুলায় অংশ নেওয়াদের হার ২৪ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। ২০১৬ সালে এসে দেখা গেল, আগের মাসে মাতাল হওয়া কিশোর ৫ শতাংশে নেমেছে, আর প্রতিদিন ধূমপান করা কিশোর ৩ শতাংশে। এখানে একটা সততার কথা বলা জরুরি। গবেষকদের একজন, আলফগেইর ক্রিস্তিয়ানসন, নিজেই বলেছেন যে এটাকে কার্যকারণ সম্পর্ক হিসেবে প্রমাণ করা যায় না। তবু তাঁর ভাষায় প্রবণতাটা পরিষ্কার: সুরক্ষার উপাদান বেড়েছে, ঝুঁকির উপাদান কমেছে, আর নেশাও কমেছে।
আইসল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের মিল কোথায়, আর কোথায় নয়
আমি বলছি না যে আইসল্যান্ডের মডেল হুবহু বাংলাদেশে বসানো যাবে। দেশ দুটির সমাজ, অর্থনীতি আর আইনি কাঠামো আলাদা। কিন্তু এই ঘটনার পেছনে যে সাধারণ নীতিটা কাজ করেছে, সেটা সমাজবিজ্ঞানে বহুদিন ধরে স্বীকৃত। ডি. ওয়েইন অসগুড ও তাঁর সহকর্মীরা ১৯৯৬ সালে আমেরিকান সোশিওলজিক্যাল রিভিউতে দেখিয়েছিলেন, বড়দের অনুপস্থিতিতে কাঠামোহীন আড্ডা বিচ্যুত আচরণের সুযোগ তৈরি করে। কারণ তিনটি: বন্ধুদের সামনে অপরাধ করা সহজ ও “লাভজনক” মনে হয়, নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো বড় মানুষ পাশে থাকে না, আর হাতে ফাঁকা সময় থাকে। এক হাজার সাতশোর বেশি তরুণের ওপর পাঁচ ধাপের জরিপে তাঁরা দেখেছিলেন, এই ধরনের আড্ডার সঙ্গে অপরাধ, অতিরিক্ত মদ্যপান আর মাদকের সম্পর্ক জোরালো। ২০০৪ সালে অসগুড ও অ্যান্ডারসন আরেকটি গবেষণায় দেখালেন, বাবা মা সন্তানের কার্যকলাপ সম্পর্কে যত বেশি খবর রাখেন, কাঠামোহীন আড্ডায় কিশোরদের সময় তত কমে। আইসল্যান্ডের সময়সীমা, সংগঠিত খেলাধুলা আর পারিবারিক সময়, এই তিনটির প্রতিটিই অসগুড এর তিনটি ঝুঁকির একটিকে সরাসরি ছোঁয়। তাই আমার মূল বক্তব্য হলো, কিশোর গ্যাং শুধু নৈতিকতার সমস্যা নয়, এটা কাঠামোর সমস্যা। এটা আমার বিশ্লেষণ, তবে এর ভিত্তি প্রমাণিত গবেষণা।
সব দোষ কি ফোনের গেমের
বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই গেমকে প্রধান আসামি করা হয়, কিন্তু বিজ্ঞান এখানে সতর্ক। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি টাস্কফোর্স ২০১৫ সালে এক শোর বেশি গবেষণা পর্যালোচনা করে বলেছিল, সহিংস ভিডিও গেমের সঙ্গে আগ্রাসী আচরণ ও চিন্তা বাড়া এবং সহমর্মিতা কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়। কিন্তু একই প্রতিবেদন বলেছিল, এই খেলা অপরাধমূলক সহিংসতা বা কিশোর অপরাধ ঘটায় কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা নেই। আর কোনো একটি ঝুঁকিই একা কাউকে সহিংস করে না, ঝুঁকি জমতে জমতেই সেই পথে ঠেলে দেয়। ২০২০ সালে সংস্থাটি আরও স্পষ্ট করে জানায়, সহিংস ভিডিও গেমের সঙ্গে সহিংস আচরণের কার্যকারণ সম্পর্কের পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গেমিং ডিসঅর্ডারকে আইসিডি এগারোতে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে শর্ত কড়া। গেমিং নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে হবে, অন্য সব কাজের চেয়ে গেম অগ্রাধিকার পাবে, ক্ষতি সত্ত্বেও খেলা চলবে, এবং সাধারণত কমপক্ষে ১২ মাস তা দেখা যেতে হবে। সংস্থাটি এও বলেছে, গেম খেলা মানুষের মধ্যে এই সমস্যা কেবল অল্প অংশের হয়। অর্থাৎ ফোনকে একমাত্র খলনায়ক বানালে ভুল হবে, আবার “গেম তো নির্দোষ” বলে ঝুঁকিটা উড়িয়ে দিলেও ভুল হবে।
আমাদের কিশোরেরা কতটা সক্রিয়, সংখ্যাটা অবাক করার মতো
আইসল্যান্ডের কর্মসূচির একটা বড় স্তম্ভ ছিল খেলাধুলা, তাই আমাদের নিজেদের অবস্থাটাও দেখা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকদের ২০১৯ সালের একটি বিশ্লেষণে ১৪৬টি দেশের ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৬ লাখ শিক্ষার্থীর তথ্য ছিল। ২০১৬ সালে বিশ্বে ৮১ শতাংশ কিশোর দিনে এক ঘণ্টা শারীরিক পরিশ্রমের সুপারিশ পূরণ করেনি। বাংলাদেশে এই হার ছিল বিশ্বে সবচেয়ে কম, ৬৬ শতাংশ; ছেলেদের ক্ষেত্রে ৬৩ শতাংশ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ৬৯ শতাংশ। ২০০১ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ৭৩ থেকে নেমে ৬৩ শতাংশে এসেছে। খবরটা ভালো শোনালেও দুটি সতর্কতা আছে। “সবচেয়ে কম” মানে এখনও প্রায় প্রতি তিনজনে দুইজন সুপারিশের নিচে। আর এই তথ্য ২০১৬ সালের, অর্থাৎ ফ্রি ফায়ার আর টিকটকের বিস্ফোরণের আগের। এর পরের তুলনাযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান আমি পাইনি। তামাকের ক্ষেত্রেও একই ফাঁক আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ পাতায় ২০১৩ সালের জরিপের যে সংখ্যা পেয়েছি, তাতে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ৬.৯ শতাংশ তামাক ব্যবহার করত। এর পরের জাতীয় তুলনা আমি পাইনি। যে সমস্যা আমরা নিয়মিত মাপি না, তার সমাধান আমরা অন্ধকারে খুঁজি, আর এই ঘাটতিটাই আমার কাছে একটা বড় খবর।
গ্যাং ধরতে গিয়ে কি কিশোর ধরা পড়ছে
সমস্যাটা যে বাস্তব, তা জুলাইয়ের শুরুর একটি প্রতিবেদনেও ধরা পড়েছে। বিডি প্রতিদিনের খবর অনুযায়ী, র্যাবের হালনাগাদ তালিকায় দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৩৩৯টি, আগের প্রতিবেদনের ২৩৭টি থেকে ১০২টি বেশি। প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, প্রতিটি দলে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ জন থাকে, যাদের বেশির ভাগ মাদকাসক্ত। কাজেই পুলিশের কঠোর অবস্থানের পেছনে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দাবি আছে। কিন্তু সমকালের প্রতিবেদনে কিছু অস্বস্তিকর দৃশ্যও আছে। চট্টগ্রামে এক কলেজশিক্ষার্থীর বাবার দাবি, ছাত্র পড়াতে যাওয়ার পথে তাঁর ছেলেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, অথচ সে কোনো গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল না; রাতে মুচলেকা দিয়ে তাকে ছাড়াতে হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও চট্টগ্রামের কোনো থানায় তাঁরা ছিলেন না। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু, এবং এই আইনে গ্রেপ্তারের পর মা বাবা ও প্রবেশন কর্মকর্তাকে জানানো, থানায় শিশুবিষয়ক ডেস্ক রাখার মতো ব্যবস্থাও আছে। যে আইন কিশোরদের সুরক্ষা দেয়, সেই আইনের প্রক্রিয়া মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি। ধরপাকড় জরুরি হতে পারে, কিন্তু সেটা দমকল বাহিনীর কাজ, আগুন লাগার পরে আসে।
আগুন যেন না লাগে, সেই কাজটা কার
আমার সারকথা হলো, কিশোরদের আড্ডাকে আবার একটা কাঠামো ফিরিয়ে দিতে হবে। অসগুড এর গবেষণা বলছে, কাঠামো আর বড়দের উপস্থিতি কমলে ঝুঁকি বাড়ে, আর বাবা মা খবর রাখলে ঝুঁকি কমে। আইসল্যান্ডের অভিজ্ঞতা তার একটি বাস্তব উদাহরণ, যদিও কার্যকারণ প্রমাণ করা যায়নি। বাংলাদেশে এর মানে হতে পারে পাড়ার একটা মাঠ বাঁচানো, স্কুলের বিকালের খেলাধুলা চালু রাখা, রাতে ফোন আলাদা রেখে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসা, আর সন্তান কার সঙ্গে সময় কাটায় তার খোঁজ রাখা। এগুলো বড় কোনো নীতির অপেক্ষা করে না, আজই শুরু করা যায়। পুলিশের অভিযান হয়তো কিছু গ্যাং ভাঙবে, কিন্তু নতুন গ্যাং যে জন্ম নেবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তাই প্রশ্নটা আসলে টাকা কিংবা ফোনের নয়, সীমানার। একটা সন্তান কোথায় থাকবে, কার সঙ্গে থাকবে, কখন ফিরবে, এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর যে ঘরে জানা থাকে, সেই ঘরের কিশোরেরা সাধারণত গ্যাংয়ের খাতায় নাম লেখায় না। উত্তরগুলো জানা আছে কি না, সেটাই আজ প্রতিটি অভিভাবকের ভাবার বিষয়।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

