পিএমআই এর মাধ্যমে মাসিক অর্থনৈতিক সূচক প্রকাশ করা হয় যা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বাড়ছে নাকি কমছে, তা নির্দেশ করে। ৫০০টির বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্রয় ব্যবস্থাপকদের ওপর জরিপ চালিয়ে এই সূচক তৈরি করা হয়। পিএমআই ৫০ পয়েন্টের বেশি হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে থাকলে সংকোচনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ৫০ থেকে সূচকের ব্যবধান যত বেশি হয়, পরিবর্তনের গতিও তত বেশি বলে বিবেচিত হয়।এটি সরাসরি দীর্ঘমেয়াদী মন্দা নির্দেশ করে না, যতক্ষণ না তা টানা কয়েক মাস ৫০-এর নিচে অবস্থান করে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে পিএমআই ছিল ৪৯.৯ পয়েন্ট। সেপ্টেম্বরে তা ১.৩ পয়েন্ট কমে ৪৮.৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো দেশের বেসরকারি খাতের কার্যক্রম সংকোচনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।২০২৪ সালের জুলাইয়ে পিএমআই ৬৩.৯ থেকে ব্যাপকভাবে কমে ৩৬.৯ পয়েন্টে নেমেছিল, যা সূচকটি চালুর পর সর্বনিম্ন অবস্থান। আগস্টে পিএমআই ছিল ৪৩.৫ পয়েন্ট।সে সময় গণ-অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতির পতন ঘটে।
সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হল উদপাদন খাত।এ খাতের পিএমআই ২.৬ পয়েন্ট কমে ৪৪.৮-এ দাঁড়িয়েছে।নির্মাণ খাতটিতে টানা মন্দা চলছে এবং সূচক ৩.৮ পয়েন্ট কমে ৪৮.৫-এ নেমে এসেছে। সেবা খাতেও টানা দুই মাস ধরে সংকোচন পর্যায়ে রয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের এর সূচক দাঁড়িয়েছে ৪৯ পয়েন্টে। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হওয়া এর জন্য দায়ী।
চারটি প্রধান খাতের মধ্যে কৃষিই একমাত্র খাত, যেখানে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। টানা ১৩ মাস ধরে এ খাতের কার্যক্রম সম্প্রসারণে থাকলেও সেপ্টেম্বরে কৃষির পিএমআই ১.৩ পয়েন্ট কমে ৫৫.২-এ নেমেছে। নতুন ব্যবসা, সামগ্রিক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান বাড়লেও বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। উপকরণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যদিও এ বৃদ্ধির গতি সামান্য কমেছে।
দেশে হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট,মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও রাজস্ব ঘাটতি । অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ধারাবাহিক দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাবে বাড়ছে পণ্য ও সেবার দাম, আর সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। তাই দারিদ্র্যের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে আরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ হল ২১.৫৩ শতাংশ, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিও ছিল প্রায় ২ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিকে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলছেন, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩.৭১ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হার (সাময়িক) আরো কমে ২.৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ শতাংশ, তবে তা অর্জিত হয়নি।গত ৩৩ বছরের মধ্যে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
সর্বশেষ পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচকের তথ্য তুলে ধরে পিইবি চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলায় বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিশীলতা এখনো চাপে রয়েছে।”
অর্থাৎ এই সমস্যা সমাধানের জন্য গতি পুনরুদ্ধার সহ অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা শক্তিশালী করা, নির্ভযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা সহজ করা এবং ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।তবে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করবে বলে আশা করা যায়। ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশাও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)
সিটিজেন্স ভয়েস

