সৌদি আরবে ন্যায়বিচার, শরিয়াহ আইনের প্রয়োগ ও অভিবাসী শ্রমিকের মানবাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
একটি দেশের বিচারব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি শুধু অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি দেওয়ার মধ্যে নয়; বরং অপরাধের অভিযোগ কতটা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান কি না এবং ভুক্তভোগী ধনী-গরিব, নাগরিক-বিদেশি—সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত হয় কি না, তার মধ্যেই নিহিত।
ঘটনা কী
২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও স্মৃতি আখতার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে তাজিরের আওতায় এই দণ্ড দেওয়া হয়; তবে কথিত কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, সময় ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জানিয়েছে, কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬)
অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আরও বেশি জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মোবাইল ভিডিওকে মামলার সূত্রপাত বলা হলেও এ বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বাধীন তথ্য নেই; তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নথি দরকার। কনস্যুলেটকে না জানানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়ার অধিকার আছে।
এখান থেকেই আরেকটি প্রশ্ন ওঠে: সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি নারীদের ওপর নির্যাতন ও রহস্যজনক মৃত্যুর অভিযোগে বিচার ও জবাবদিহি কতটা হয়েছে?
নির্যাতিত নারী গৃহকর্মীদের অভিজ্ঞতা
২০১৯ সালে আল জাজিরার প্রতিবেদনে ফেরত আসা নারী গৃহকর্মীরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বেতন না পাওয়া, যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন ও আটকে রাখার অভিযোগ করেন; কেউ কেউ পুলিশের কাছে গিয়েও সুরক্ষা পাননি বলে জানান। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সৌদি আরবে অন্তত ৬৬ বাংলাদেশি নারী কর্মীর মৃত্যু হয়, যার ৫২টি আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। (সূত্র: আল জাজিরা, ৩১ অক্টোবর ও ৮ নভেম্বর ২০১৯)
এই পরিসংখ্যান কয়েক বছর আগের, বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র নয়। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শারীরিক আঘাত, যৌন সহিংসতা, বেআইনি আটক, জবরদস্তিমূলক শ্রম বা মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধ হতে পারে। জানা দরকার: কতটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে, কতজন অভিযুক্ত জবাবদিহি করেছেন, কতজন ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
মৃত্যুর সনদই কি শেষ কথা?
বিদেশে নারী কর্মীর মৃত্যুতে পরিবার শোকের পাশাপাশি প্রকৃত কারণ জানার অনিশ্চয়তায় পড়ে। ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে সন্দেহ, মরদেহ ফিরতে দেরি এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জটিলতার কথা উঠে আসে। (সূত্র: আল জাজিরা, ৩ নভেম্বর ২০১৯)
স্বাভাবিক মৃত্যুর সনদ মানেই নির্যাতনের অভিযোগ সত্য নয়, আবার সব প্রশ্নের অবসানও নয়। সন্দেহজনক ক্ষেত্রে স্বাধীন ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং পরিবারকে তদন্তের ফল জানানো জরুরি। মরদেহ ফেরত পাঠানো রাষ্ট্রের দায়িত্বের শেষ ধাপ নয়।
আইন আছে, বাস্তবে সুরক্ষা কতটা?
সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের জন্য কোনো বিধি নেই—এমন দাবি সঠিক নয়। সৌদি মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বিধিতে নিয়োগকর্তার জন্য পাসপোর্ট আটকে না রাখা, নির্যাতন ও যৌন হয়রানি থেকে বিরত থাকা, বেতন, আবাসন ও খাবার নিশ্চিত করা এবং দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার কথা আছে। তবে আইএলওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী সাধারণ শ্রম আইনের সুরক্ষা সব গৃহকর্মীর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। (সূত্র: সৌদি মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়; আইএলও, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩)
সমস্যা অধিকার থাকা আর তা প্রয়োগ করতে পারার ব্যবধানে: বিচ্ছিন্ন কর্মস্থল, ভাষাগত বাধা, কাগজপত্র নিয়ে জটিলতা, চাকরি হারানোর ভয় ও আইনি সহায়তার অভাব।
সৌদি আদালতে নিয়োগকর্তার বিচার যে হয় না, তা-ও নয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশি গৃহকর্মী আবিরন বেগমকে হত্যার দায়ে আয়েশা আল-জিজানির মৃত্যুদণ্ড হয়। (সূত্র: আল জাজিরা, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১) তবে একটি মামলায় শাস্তি মানেই সব অভিযোগে কার্যকর বিচার নয়। প্রতিটি সন্দেহজনক মৃত্যু কি একই গুরুত্বে তদন্ত হয়? ভুক্তভোগী কি নিরাপদে সাক্ষ্য দিতে পারেন? এসব জানতে বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়, সামগ্রিক তথ্য দরকার।
তাজির, দিয়াত ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড
তাজির এমন শাস্তি, যেখানে ধরন ও মাত্রা নির্ধারণে বিচারকের বিবেচনার ভূমিকা থাকে। দিয়াত বা ‘ব্লাড মানি’ নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রদেয় আর্থিক ক্ষতিপূরণ; এটি সব অপরাধে প্রযোজ্য নয় এবং ক্ষতিপূরণ, তদন্ত ও ফৌজদারি জবাবদিহি এক জিনিস নয়।
শরিয়াহভিত্তিক আইন থাকলেই প্রতিটি রায় প্রশ্নের ঊর্ধ্বে যায় না; আবার কঠোর শাস্তি মানেই ন্যায়বিচার নয়। মানদণ্ড সবার জন্য এক: নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, আইনজীবীর সহায়তা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, কার্যকর পর্যালোচনা এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির সামঞ্জস্য। যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে—অপরাধীর পরিচয়, নাগরিকত্ব বা ক্ষমতা যেন বিচারের বাধা না হয়।
বাংলাদেশের দায়িত্ব কি শুধু মরদেহ ফিরিয়ে আনা?
অবশ্যই না এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায় (দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানকারী) সরকারের। এজন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী
পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়া: অভিযোগ, রায়, আপিলের সুযোগ, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং আগে না জানানোর কারণ।
পরিসংখ্যান প্রকাশ: অভিযোগ, মামলা, ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণের হালনাগাদ হিসাব।
ভুক্তভোগীর সুরক্ষা: নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, দোভাষী, আইনি সহায়তা ও দ্রুত দেশে ফেরার ব্যবস্থা।
দেশের ভেতরে জবাবদিহি: প্রতারণা, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় ও তথ্য গোপন করা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।
দুই দেশের সহযোগিতা: সন্দেহজনক মৃত্যুতে তথ্য বিনিময়, ময়নাতদন্তের ফল পরিবারকে জানানো ও ক্ষতিপূরণ আদায়।
ন্যায়বিচার কি শুধু ক্ষমতাবানদের জন্য?
পরিবারের ঋণ শোধ বা সন্তানের পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়া নারী যদি নির্যাতন বা মৃত্যুর মুখোমুখি হন, তাঁর পরিবার শুধু স্বজন নয়, ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তাও হারায়। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় যা-ই হোক, তাঁরও ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। দুটি বিষয়কেই একই মানদণ্ডে দেখতে হবে।
আমাদের দাবি কোনো দেশের প্রতি বিদ্বেষ নয়, কোনো ধর্মীয় আইনের প্রতি অবজ্ঞাও নয়: দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক বিবরণ প্রকাশ হোক, নির্যাতিত নারী গৃহকর্মীদের অভিযোগ ও মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, দোষ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিচার ও পরিবারগুলোর অধিকার নিশ্চিত হোক। কারণ ন্যায়বিচারের আসল পরীক্ষা শুধু শাস্তির কঠোরতায় নয়—ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে বিচার কতটা কার্যকর, ভুক্তভোগী কতটা সুরক্ষিত এবং অভিযুক্ত ন্যায্য বিচার পেলেন কি না, তাতে।

