ভিডিওটা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় ধরে স্কুলড্রেস পরা দুই কিশোরী হেঁটে যাচ্ছে, স্বাভাবিক একটা বিকেল। হঠাৎ পেছন থেকে ছুটে এসে এক কিশোর একজনকে সজোরে লাথি মারে। মেয়েটি ঘুরে প্রতিবাদ করে আর তার পুরস্কার হিসেবে জোটে আরেকটা লাথি।
ভিডিওটা প্রায় এক মাস আগের। কিন্তু সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের এই ঘটনা এখন সবার মুখে মুখে। ভুক্তভোগী কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী।
এতদূর পর্যন্ত গল্পটা দুঃখজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এমন সহিংসতার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। আসল ধাক্কাটা লাগে তারপর।
অপরাধীর বদলে কাঠগড়ায় ভুক্তভোগী
স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল মেয়েটির। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রীর পাশে দাঁড়াবে, তাকে নিরাপত্তা দেবে, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করবে। বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত কিশোরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ভুক্তভোগী ছাত্রীকেই বিদ্যালয় থেকে টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল মতিন প্রধানের ব্যাখ্যা, বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং ছাত্রীর আচরণ ছিল উচ্ছৃঙ্খল। এই যুক্তিতেই পরিচালনা কমিটি, এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা মিলে ছাত্রীর পরিবারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ধরিয়ে দেয়।
এখানেই প্রশ্নটা তীব্র হয়ে ওঠে যে মেয়ে রাস্তায় লাথি খেল, আর সেই লাথি খাওয়ার দায়ও কি শেষমেশ তার নিজের ঘাড়েই বর্তাল?
স্কুল চলাকালে বাইরে যাওয়া যদি সত্যিই নিয়মের ব্যত্যয় হয়, সেটি নিঃসন্দেহে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়, তার একটা মীমাংসাও দরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ব্যত্যয়ের শাস্তি কি এতটাই কঠোর হতে পারে যে একটি শিশু তার শিক্ষা থেকেই ছিটকে পড়ে? বিশেষত যখন সে একই সঙ্গে প্রকাশ্য নির্যাতনের শিকার?
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে যুক্তি দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা, সেটাই আসলে এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুনাম তৈরি হয় তখনই, যখন সে অন্যায়ের মুখে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ায়, অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ভুক্তভোগীকে সরিয়ে দিয়ে সুনাম রক্ষার চেষ্টা আসলে প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ব্যর্থতাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে।
ঘটনার পর অভিযুক্ত কিশোরকে স্থানীয়ভাবে কান ধরে ওঠবস করানো এবং জনসমক্ষে ক্ষমা চাওয়ানোর একটি ভিডিওও প্রকাশ পায়, যা নিজেই আরেকটি বিতর্কের জন্ম দেয়, কেননা এটি নিজেও একধরনের অবমাননাকর শাস্তি। পরবর্তীতে জেলা সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন কর্মকর্তার মাধ্যমে ছেলেটিকে তার মা-বাবার জিম্মায় দেওয়া হয় এবং ছয় মাসের কাউন্সেলিং ও প্রবেশন তত্ত্বাবধানের সিদ্ধান্ত হয়।
অভিযুক্তের বয়স আনুমানিক ১১ বছর, অর্থাৎ সে নিজেও শিশু। তার জন্য শাস্তির বদলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া আইনি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন শিশু-অপরাধীর জন্য যদি সংশোধনের সুযোগ থাকে, তাহলে নির্যাতনের শিকার শিশুটির জন্য সুরক্ষা, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও শিক্ষা-ধারাবাহিকতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা কোথায়?
আইন কী বলে
বাংলাদেশে শিশু-সংক্রান্ত এই ধরনের ঘটনায় একাধিক আইনি কাঠামো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
শিশু আইন, ২০১৩-এর মূল ভিত্তিই হলো “শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ” (best interest of the child), অর্থাৎ শিশু-সংশ্লিষ্ট যেকোনো সিদ্ধান্তে শিশুর কল্যাণকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই আইনে “আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু” (Children in Contact with the Law), অর্থাৎ যে শিশু কোনো অপরাধের শিকার বা সাক্ষী—তার জন্য মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের বিশেষ বিধান রয়েছে। এই ছাত্রীটি স্পষ্টতই সেই শ্রেণিতে পড়ে, ফলে তাকে বাড়তি সুরক্ষা দেওয়া কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব, শাস্তি দেওয়া নয়। একই আইনে “আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু”দের জন্য বিকল্প পন্থা, প্রবেশন ও কাউন্সেলিংয়ের যে বিধান আছে, অভিযুক্ত কিশোরের ক্ষেত্রে সেটিই প্রয়োগ হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
দণ্ডবিধির ধারা ৮২ ও ৮৩ অনুযায়ী, ৯ বছরের কম বয়সী শিশুর ফৌজদারি দায় নেই, আর ৯ থেকে ১২ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় সে কাজের পরিণতি বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা অর্জন করেছিল কি না। অভিযুক্তের বয়স বিবেচনায় এই বিধানের আওতায় তার প্রতি শাস্তির বদলে সংশোধনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়াটা তাই আইনসম্মত।
তবে এই একই আইনি যুক্তি ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত ছিল, তাকে “শাস্তি” নয়, “সুরক্ষা” প্রাপ্য।
এর বাইরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯-এর অন্যতম পক্ষরাষ্ট্র, যেখানে শিক্ষার অধিকার ও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ সুরক্ষার অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে বর্ণিত। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে সব শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা আছে।
কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন
কেন একটি মেয়েকে লাথি মারার ভিডিও দেখে আমাদের প্রথম প্রশ্ন হয়ে ওঠে; “মেয়েটি সেখানে কেন গিয়েছিল?” অথচ প্রশ্ন করি না একজন কিশোর কেন তাকে লাথি মারল? নাকি মেয়ে বলে তাকে সবসময় আইনের কাঠগড়ায় দাড় করানোটা এখন আমাদের অভ্যাসে পরিনত হয়েছে।
এই প্রবণতাই আসলে সোনারগাঁয়ের ঘটনার মূলে। ভুক্তভোগীকে সন্দেহের চোখে দেখা, তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, অথচ যে সহিংসতা তার ওপর ঘটল, তার জবাবদিহি আড়ালে চলে যাওয়া, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা মানসিকতার প্রতিফলন।
আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করায় নয়, ভুক্তভোগী যেন অন্যায়ের কারণে দ্বিতীয়বার শাস্তি না পায়, সেটিও তারই অংশ। সোনারগাঁয়ের এই ছাত্রী এখন ঠিক সেই দ্বিতীয় শাস্তিরই শিকার।
আজ একটি মেয়ে লাথি খেয়ে স্কুল থেকে বিদায় নিল। আগামীকাল আরেকটি মেয়ে যদি নির্যাতনের শিকার হয়ে ভাবে যে তাকেই দায় নিতে হবে তাইলে সে কোনদিন আইনের প্রতি বিশ্বাস আনতে পারবে না। এরপরে ধর্ষন বা ডামেস্টিক ভায়োলেন্সের মত অফেন্সকেও সামনে আনতে মেয়েরা ভয় পাবে।
সোনারগাঁয়ের এই ছোট্ট মেয়েটির গল্প তাই কেবল একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভুল নয়। এটা আমাদের সামনে আয়না ধরে জিজ্ঞেস করছে, আমরা কি সত্যিই এমন একটা সমাজ গড়তে চাই, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে আর জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স দূর হবে? নাকি একটি ভিডিও ভাইরাল হলে কয়েক দিনের ক্ষোভ প্রকাশ করেই আমরা দায়িত্ব শেষ করব?
উত্তরটা এখনো আমাদের হাতেই।

