বিশেষ প্রতিবেদন
সরকার যখন বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন বিষয়টি শুধু সরকারের দেনা বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসার ঋণ, বিনিয়োগ, সুদের হার এমনকি অর্থনীতির গতি ওপরও। বাংলাদেশে বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
একই টাকার জন্য প্রতিযোগিতা কেন?
সহজ করে ভাবুন, একটি ব্যাংকের হাতে আমানতকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সীমিত পরিমাণ অর্থ আছে। এই অর্থ ব্যাংককে কোথাও না কোথাও কাজে লাগাতে হবে। একদিকে সরকার সেই ব্যাংক থেকে ঋণ চাইছে, অন্যদিকে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন কারখানা করতে, কোনো ব্যবসায়ী কার্যকরী মূলধন বাড়াতে কিংবা কোনো উদ্যোক্তা নতুন ব্যবসা শুরু করতে ঋণ চাইছেন। ব্যাংক যদি তার তহবিলের বড় অংশ সরকারকে দেয়, তখন একই তহবিলের জন্য বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। অর্থনীতিতে এটিই মূলত ‘ক্রাউডিং আউট’ হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও স্পষ্ট, কারণ সরকারি ঋণের বড় অংশই ব্যাংকনির্ভর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, দেশের সরকারি সিকিউরিটিজের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যাংকিং খাত ধারণ করে এবং দেশীয় অর্থায়নে ব্যাংকের ওপর বেশি নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণকে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। এমনকি ২০২৫ সালের আইএমএফ মূল্যায়নেও একই সতর্কতার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ টাকা নিলেই বেসরকারি খাতের ঋণ থেকে ঠিক ১ লাখ টাকা কমে যাবে, এমন সরল হিসাব নেই। সরকার যে টাকা ঋণ নেয়, পরে সেটি বেতন, ঠিকাদারের বিল, পণ্য কেনা বা বিভিন্ন সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে আবার ফিরে আসে। ফলে টাকাটি একেবারে ‘গায়েব’ হয়ে যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, সেই টাকা কোন পথে ফিরে আসছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কতটা তারল্য রাখছে বা তুলে নিচ্ছে।
আসল চাপটা পড়ে ব্যাংকের সিদ্ধান্তে
সরকারের ঋণ নেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো ব্যাংকের বিনিয়োগের পছন্দ বদলে যাওয়া। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড সাধারণত তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে একটি ব্যাংকের সামনে যখন সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ রাখার সুযোগ থাকে, তখন দুর্বল আর্থিক অবস্থার কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া অনেক সময় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, FY25-এ বাংলাদেশের সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকিং খাতের অংশ ছিল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের মতো।
এখানেই ‘লিকুইডিটি’ বা তারল্যের বিষয়টি আসে। ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত আমানত থাকলেও সেই অর্থ যদি সরকারি ঋণ বা সরকারি সিকিউরিটিজে আটকে থাকে, তাহলে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ দুটিই কমতে পারে। আর ব্যাংক যদি বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে বেশি ঝুঁকি মনে করে, তাহলে ঋণের সুদও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। অর্থাৎ ব্যবসায়ী তখন শুধু ঋণ পাচ্ছেন কি না, সেটিই নয় কত দামে ঋণ পাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্চ ২০২৬-এ দেশের পাবলিক সেক্টর ক্রেডিটের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ, যেখানে প্রাইভেট সেক্টর ক্রেডিটের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত বেড়েছিল ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সেই হারে বাড়েনি; বরং সরকারি খাতের ঋণ দ্রুত বেড়েছে।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা দরকার। বেসরকারি খাতে ঋণ কমার পুরো কারণ সরকার বেশি ঋণ নিয়েছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। বাংলাদেশে উচ্চ সুদ, দুর্বল বিনিয়োগ চাহিদা, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতাও ঋণের চাহিদা কমিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে ঋণগ্রহীতাদের দুর্বল চাহিদা, উচ্চ ঋণব্যয় এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি ভূমিকা রেখেছে; বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক বেশি।
আজ চাপ কম দেখা গেলেও কাল সমস্যা বড় হতে পারে
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। এখন যদি ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নতুন কারখানা, মেশিন বা বড় বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিতে আগ্রহী না হন, তাহলে সরকার বেশি ঋণ নিলেও ‘ক্রাউডিং আউট’ তাৎক্ষণিকভাবে খুব বেশি চোখে নাও পড়তে পারে। কিন্তু অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে, বিনিয়োগের চাহিদা বাড়লে এবং বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ চাইতে শুরু করলে একই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরকারের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা তীব্র হবে। তখন সরকারি ঋণ কমানোর সুযোগ না থাকলে সুদের হার বা ঋণের প্রাপ্যতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
এই ঝুঁকির কারণেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের পরিকল্পনা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ বলেছে, এ ধরনের ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি সীমিত করে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসও।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, FY27-এর ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা শুনতে বিশাল হলেও এটি FY26-এর প্রকৃত ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণের চেয়ে কম। অর্থাৎ সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংকনির্ভরতা কিছুটা কমানোর লক্ষ্য দেখিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির জন্য প্রশ্ন থেকে যায় এই অর্থায়ন কি সত্যিই কমবে, নাকি রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে বছর শেষে আবার ব্যাংকের কাছেই ফিরতে হবে? কারণ FY26-এ রাজস্ব ঘাটতিই সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ানোর অন্যতম বড় কারণ ছিল।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সরকারের ঋণ নেওয়া নিজে কোনো খারাপ বিষয় নয়। রাস্তা, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা এমন কোনো প্রকল্পে ঋণ নিয়ে ব্যয় করা হলে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, সেই ঋণের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবও থাকতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যাংকনির্ভর ঋণ নিয়মিতভাবে বাড়তে থাকে এবং একই সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কমে যায়।
তাই বাংলাদেশের জন্য আসল সমাধান শুধু ‘সরকার কম ঋণ নেবে’ এতটা সরল নয়। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ও করপোরেট বন্ডের বাজার বড় করা, বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সরকারি ঋণের বাজারে আনা এবং ব্যাংকের বাইরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। আইএমএফও বাংলাদেশের দেশীয় ঋণবাজারের বিনিয়োগকারীভিত্তি বিস্তৃত করা এবং ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ‘সরকারের টাকা বনাম বেসরকারি খাতের টাকা’ নয়; বিষয়টি হলো সীমিত আর্থিক সম্পদ কে কতটা দক্ষভাবে ব্যবহার করছে। সরকার যদি ব্যাংকের বড় অংশের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করে, অথচ উদ্যোক্তারা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী ঋণ না পান, তাহলে আজকের বাজেট ঘাটতি মেটানোর খরচ আগামী দিনের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গিয়ে পড়তে পারে। আর সেখানেই ক্রাউডিং আউটের আসল ঝুঁকি টাকা অর্থনীতিতে থাকে, কিন্তু যে জায়গায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদন তৈরি করতে পারত, সেখানে পৌঁছায় না।

