বিশেষ প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে কোনো কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ দিলে অনেক বিনিয়োগকারী সেটিকে ভালো কোম্পানির লক্ষণ মনে করেন। আবার কোনো কোম্পানি লভ্যাংশ না দিয়ে মুনাফা ব্যবসায় রেখে দিলে প্রশ্ন ওঠে কোম্পানি কি তাহলে বিনিয়োগকারীদের টাকা দিচ্ছে না? আসলে দুটির কোনোটিই একা ভালো বা খারাপের প্রমাণ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কোম্পানি যে টাকা রেখে দিচ্ছে, সেটি দিয়ে কতটা ভালো ব্যবসা তৈরি করতে পারছে।
লাভটা হাতে এলে ভালো, নাকি ব্যবসায় থাকলেই ভালো?
ধরা যাক, একটি কোম্পানি বছরে ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ৬০ কোটি টাকা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ হিসেবে দিয়ে বাকি ৪০ কোটি টাকা ব্যবসায় রেখে দিতে পারে। আবার পুরো ১০০ কোটি টাকাই রেখে নতুন কারখানা, প্রযুক্তি, নতুন বাজার বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী আজই নগদ টাকা পাচ্ছেন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তিনি আশা করছেন, এই ১০০ কোটি টাকা ভবিষ্যতে আরও বেশি মুনাফা তৈরি করবে। অর্থাৎ লভ্যাংশ হলো আজকের নিশ্চিত রিটার্ন, আর রিটেইনড আর্নিংস হলো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রিটার্ন। এখানেই পুরো বিতর্কের আসল জায়গা।
করপোরেট ফাইন্যান্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো রিটেনশন রেশিও কোম্পানি তার মুনাফার কত অংশ ব্যবসায় রেখে দিচ্ছে। আর কোম্পানির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আসওয়াথ দামোদরনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যদি মুনাফার বড় অংশ ধরে রাখে এবং সেই অর্থ বিনিয়োগ করে ভালো রিটার্ন অন ইক্যুইটি বা আরওই তৈরি করতে পারে, তাহলে তার ভবিষ্যৎ আয়ের প্রবৃদ্ধি বেশি হতে পারে। সহজ করে বললে, ১০০ টাকা রেখে যদি কোম্পানি নিয়মিত ২০ টাকা আয় করতে পারে, তাহলে টাকা রেখে দেওয়ার যুক্তি আছে। কিন্তু ১০০ টাকা রেখে যদি সেই টাকা অলস পড়ে থাকে বা মাত্র ২-৩ টাকা আয় করে, তখন প্রশ্ন উঠবেই এই টাকা শেয়ারহোল্ডারদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া কি বেশি যুক্তিযুক্ত ছিল না?
গ্রোথ কোম্পানি আর ম্যাচিউর কোম্পানির পার্থক্য
একটি নতুন বা দ্রুত বাড়তে থাকা কোম্পানির সামনে সাধারণত বিনিয়োগের সুযোগ বেশি থাকে। নতুন বাজার ধরতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে, প্রযুক্তিতে টাকা দিতে হবে, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। ফলে এমন কোম্পানির জন্য মুনাফা ব্যবসায় রেখে দেওয়া অনেক সময় যৌক্তিক। একাডেমিক গবেষণাতেও দেখা যায়, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও কম পরিপক্বতার কোম্পানিগুলো সাধারণত মুনাফা ধরে রাখার দিকে বেশি ঝোঁকে; বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত ও কম প্রবৃদ্ধির কোম্পানির বিনিয়োগের সুযোগ কমে এলে লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
এখন উল্টো ছবিটা দেখুন। একটি কোম্পানি বহু বছর ধরে বাজারে আছে, তার বিক্রি ও মুনাফা মোটামুটি স্থিতিশীল, নতুন বড় কারখানা করার প্রয়োজন নেই, বাজার সম্প্রসারণের সুযোগও সীমিত। এমন অবস্থায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকা জমিয়ে রাখার অর্থ কী? টাকা যদি ব্যবসায় এমন কোনো নতুন সুযোগ তৈরি না করে, তাহলে সেটি কেবল ব্যালান্সশিট ভারী করতে পারে। বরং সেই অর্থের একটি অংশ শেয়ারহোল্ডারদের ফিরিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে। এ কারণেই প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে নিয়মিত লভ্যাংশকে অনেক সময় ব্যবসার দুর্বলতা নয়, বরং অতিরিক্ত নগদ ব্যবহারের একটি স্বাভাবিক কৌশল হিসেবে দেখা হয়। ম্যাককিনসির বিশ্লেষণেও দেখা যায়, বড় ও স্থিতিশীল কোম্পানিগুলো সাধারণত লভ্যাংশ কমাতে চায় না; ভালো সময়ে বড় ধরনের লভ্যাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত খুবই বিরল।
তবে এখানেই বিনিয়োগকারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল হতে পারে। উচ্চ লভ্যাংশ মানেই ভালো কোম্পানি নয়। কোনো কোম্পানি যদি ব্যবসার ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের টাকা না রেখে শুধু শেয়ারহোল্ডারদের খুশি করতে বড় লভ্যাংশ দেয়, তাহলে স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগকারী খুশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার বিপরীত ঘটনাও সত্যি কোম্পানি বছরের পর বছর ‘ভবিষ্যতে বড় হবে’ যুক্তিতে মুনাফা রেখে যাচ্ছে, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে মুনাফা বা শেয়ারহোল্ডারদের সম্পদ বাড়ছে না। তখন রিটেইনড আর্নিংস আর শক্তি নয়, বরং অকার্যকর মূলধন ব্যবহারের সংকেত হয়ে উঠতে পারে। দামোদরনের বিশ্লেষণেও লভ্যাংশের ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্টের মূল প্রশ্ন হিসেবে অতিরিক্ত নগদ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাহলে বিনিয়োগকারী কোন কোম্পানিকে বেশি পছন্দ করবেন?
এখানে একটি সহজ হিসাব কাজে লাগে। কোম্পানি যদি টাকা রেখে মূলধনের খরচের চেয়ে বেশি রিটার্ন তৈরি করতে পারে, তাহলে টাকা ব্যবসায় রাখা মূল্যবান। ধরুন, কোনো কোম্পানির নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে ১৮ শতাংশ রিটার্ন পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা আছে, অথচ ওই কোম্পানির মূলধনের খরচ ১০ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে মুনাফা রেখে পুনঃবিনিয়োগ করা শেয়ারহোল্ডারের জন্যও লাভজনক হতে পারে। কিন্তু যদি নতুন বিনিয়োগে সম্ভাব্য রিটার্ন ৭ শতাংশ হয়, অথচ মূলধনের খরচ ১০ শতাংশ, তাহলে শুধু ‘কোম্পানি বড় হবে’ বলে টাকা আটকে রাখার অর্থ কমে যায়। সেই অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়া, ঋণ কমানো কিংবা অন্যভাবে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা বেশি যুক্তিযুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ ভালো কোম্পানি সেই নয় যে বেশি লভ্যাংশ দেয়; ভালো কোম্পানি হলো যে শেয়ারহোল্ডারের টাকায় শেয়ারহোল্ডারের জন্য ভালো রিটার্ন তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের বাজারে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকা, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটেও বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকার কথা বলা হয়েছে এবং FY26 প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোম্পানির হাতে থাকা মুনাফা কোথায় যাচ্ছে নতুন বিনিয়োগে, ঋণ পরিশোধে, নাকি শুধু জমে থাকছে এই প্রশ্নটি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামোতেও মুনাফা ধরে রাখার অর্থ যে ইচ্ছেমতো টাকা জমিয়ে রাখা নয়, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ২০২২ সালের নির্দেশনায় স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ারের ক্ষেত্রে জমা রাখা মুনাফা ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং তার ব্যবহার সম্পর্কে প্রকাশের কথা বলা হয়েছে; একই সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোম্পানির লভ্যাংশ দেওয়ার ইতিহাস ও রিটেইনড আর্নিংস এর অবস্থাও বিবেচনায় আসে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের মূলধন কাঠামোয় রিটেইনড আর্নিংস মূলধনের একটি অংশ হিসেবে গণ্য হয় এবং মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে লভ্যাংশ বিতরণেও বিধিনিষেধ আসতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা ‘লভ্যাংশ ভালো নাকি রিটেইনড আর্নিংস ভালো’ এভাবে করলে উত্তর পাওয়া যাবে না। বরং বিনিয়োগকারীর প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোম্পানি আমার টাকাটা কী করছে? দ্রুত বাড়তে থাকা কোম্পানি যদি মুনাফা রেখে সেই টাকা দিয়ে উচ্চ রিটার্নের নতুন ব্যবসা তৈরি করতে পারে, সেখানে কম লভ্যাংশও ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। আর বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানি যদি নতুন বিনিয়োগের ভালো সুযোগ না পেয়েও বিপুল নগদ জমিয়ে রাখে, সেখানে নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া বরং বেশি যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। তাই শুধু ডিভিডেন্ড ইয়েল্ড দেখে কোম্পানি বিচার করার বদলে মুনাফা, রিটেনশন রেশিও, আরওই, বিনিয়োগের সুযোগ, নগদ প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি সবকিছু একসঙ্গে দেখা দরকার। কারণ শেষ বিচারে শেয়ারহোল্ডারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোম্পানি আজ কত টাকা দিচ্ছে নয়, বরং আজকের টাকা দিয়ে আগামী দিনে কত বেশি মূল্য তৈরি করতে পারছে।

