বিশেষ বিশ্লেষণ
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ১৯৪৭ সাল ছিল এক টার্নিং পয়েন্ট। ব্রিটিশ শাসনের অবসান, জন্ম নিল ভারত ও পাকিস্তান। পরে ১৯৭১ সালে এল বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে সামনে এলো অকল্পনীয় দারিদ্র্য, চরম বৈষম্য আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এমন এক সময়ে কেমব্রিজের ক্লাসরুমে বসে পড়াশোনা করছিলেন ছয় তরুণ। তাঁদের কেউ ছিলেন ভারতের, কেউ পাকিস্তানের, কেউ সিলনের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা), আর কেউ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ)। তাঁরা সবাই পড়েছেন অর্থনীতি। আর তাঁদের হাত ধরেই বদলে গেছে উন্নয়ন অর্থনীতির পুরো চেহারা।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ডেভিড সি. এঞ্জারম্যান তাঁদের ডেকেছেন ‘অ্যাপোস্টলস অব ডেভেলপমেন্ট’ উন্নয়নের দূত। অমর্ত্য সেন, জগদীশ ভগবতী, মনমোহন সিং, মাহবুব উল হক, রেহমান সোবহান এবং লাল জয়াবর্ধনে। ২০২৫ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত এঞ্জারম্যানের বইটি তাঁদের জীবন ও চিন্তার গল্প বলে। দশটি দেশের আর্কাইভ আর প্রায় ১০০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি এই বইয়ের মূল বার্তা – উন্নয়ন কখনোই শুধু পশ্চিমাদের গল্প ছিল না। এটি ছিল দক্ষিণের মানুষের সংগ্রামের গল্প।
১৯৫০-এর দশকে কেমব্রিজে তখন উন্নয়ন অর্থনীতি নামে আলাদা কোনো বিষয় ছিল না। তাঁরা শিখেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিখেছেন সরকারের ভূমিকা, শিখেছেন অর্থনীতি কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়, বরং এটি একটি তর্ক। কেমব্রিজের শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জোয়ান রবিনসন, যিনি কেইনসের চিন্তাকে আরও বামপন্থী করে ব্যাখ্যা করতেন। কিন্তু ছয় অর্থনীতিবিদ কাউকেই অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি। তাঁরা নিজেদের মতো করে ভেবেছেন, নিজেদের দেশের বাস্তবতার আলোকে। এঞ্জারম্যানের ভাষায়, তাঁরা শিখেছিলেন ‘অর্থনীতি হলো তর্ক, গোঁড়ামি নয়’। আর এ কারণেই তাঁদের চিন্তাধারা এত বৈচিত্র্যময়; কেউ ছিলেন বাজারের পক্ষে, কেউ রাষ্ট্রের, কেউ আবার মাঝামাঝি কোনো পথ খুঁজেছেন।
এই ছয়জনের মধ্যে অমর্ত্য সেন হয়তো সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া এই চিন্তাবিদ উন্নয়নের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন। তাঁর ‘ক্যাপাবিলিটি’ (সক্ষমতা) ও ‘এনটাইটেলমেন্ট’ (অধিকার) তত্ত্ব দেখিয়েছে মানুষের জীবন মান শুধু তার আয় দিয়ে মাপা যায় না। তিনি বলেছেন, উন্নয়ন মানে মানুষের স্বাধীনতা। একজন মানুষ কী করতে পারে, কী হতে পারে সেটাই আসল মাপকাঠি। শুধু জিডিপি বাড়লেই হয় না, মানুষের সুস্থতা, শিক্ষা, স্বাধীনতাও জরুরি। তাঁর এই চিন্তা বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর উন্নয়ন সংজ্ঞাকেও পাল্টে দিয়েছে।
অমর্ত্য সেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন মাহবুব উল হক। পাকিস্তানের এই অর্থনীতিবিদ ছিলেন মানুষের উন্নয়নের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে তিনি চালু করেন হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স (এইচডিআই) যেটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সূচক। হকের যুক্তি ছিল সরল কিন্তু গভীর-উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, এটি মানুষের জীবনমানের উন্নতি। তিনি অর্থনীতিবিদদের বলেছেন, জিডিপির পাশাপাশি দেখতে হবে আয়ু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য – এগুলোই আসল উন্নয়ন। তাঁর এই চিন্তা আজকের বিশ্বে এতটাই প্রভাবশালী যে কোনো দেশের অগ্রগতি বিচার করতে এইচডিআই এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে জগদীশ ভগবতী ছিলেন ভিন্ন সুরের। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই অর্থনীতিবিদ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উদারীকরণের প্রবক্তা। তাঁর যুক্তি ছিল – দারিদ্র্য দূর করতে হলে প্রথমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দরকার, আর প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার বাণিজ্য উদারীকরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, উন্নয়নের পথে বৈষম্য কিছুটা বাড়লেও তা সাময়িক, শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধিই সবাইকে উন্নতির পথে নিয়ে যায়। ভগবতীর চিন্তা ছিল অনেকটাই বাজার-বান্ধব, যা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীতিকেও প্রভাবিত করেছে।
ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ছিলেন এই ছয়জনের মধ্যে সবচেয়ে বড় নীতিনির্ধারক। ১৯৯১ সালে ভারত যখন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে-মাত্র ১৫ দিনের মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ – মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের দরজা খুলে দেন। লাইসেন্স রাজের অবসান ঘটান, শিল্প খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পথ খোলেন, বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করেন। তাঁর এই সংস্কার ভারতকে অর্থনৈতিক ধস থেকে রক্ষা করে এবং পরবর্তী দুই দশকে ভারতের দ্রুত প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক নাম রেহমান সোবহান। স্বাধীনতার আগেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী থিংক ট্যাংক। সোবহানের মূল বক্তব্য ছিল – শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারও জরুরি। তিনি বারবার বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, কিন্তু বৈষম্য বেড়েছে। তাঁর মতে, সংস্কারগুলো যদি বৈষম্য কমাতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। এঞ্জারম্যান তাঁকে বলেছেন, “রেহমান সোবহান ছিলেন ব্রিফকেস হাতে একজন মুক্তিযোদ্ধা”।
লাল জয়াবর্ধনে হয়তো কম পরিচিত, কিন্তু শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি শ্রীলঙ্কার ট্রেজারি সেক্রেটারি ছিলেন এবং জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্ল্ড ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স রিসার্চ (WIDER) – এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কাঠামোগত সামঞ্জস্য নীতির বিরুদ্ধে বিকল্প চিন্তা তৈরি করতে চেয়েছেন।
এই ছয় অর্থনীতিবিদের মধ্যে মতপার্থক্যও ছিল। কেউ বলেছেন প্রবৃদ্ধি আগে, কেউ বলেছেন বণ্টন আগে। মাহবুব উল হক বলেছিলেন, প্রবৃদ্ধি ছাড়া তো শুধু ‘দারিদ্র্যের পুনর্বণ্টন’ করা যায়। আবার রেহমান সোবহান বলেছেন, প্রবৃদ্ধি যদি বৈষম্য কমাতে না পারে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি অর্থহীন। অমর্ত্য সেন হয়তো মাঝামাঝি পথ খুঁজেছেন – তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোই উন্নয়নের আসল লক্ষ্য। মনমোহন সিং বাস্তবে প্রয়োগ করেছেন উদারীকরণের নীতি। জগদীশ ভগবতী লিখেছেন বাণিজ্য নীতি নিয়ে। মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে উন্নয়ন চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
এঞ্জারম্যানের বইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো – উন্নয়ন কখনোই শুধু পশ্চিমা ধারণা ছিল না। উন্নয়ন অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করেছেন দক্ষিণের মানুষজন। তাঁরা কেমব্রিজে পড়েছেন, কিন্তু তাঁদের চিন্তার উৎস ছিল নিজ দেশের বাস্তবতা। তাঁরা দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য নিয়ে ভাবতে হলে শুধু অর্থনীতির বই পড়লেই হয় না, জানতে হয় মানুষের জীবনও।
আজকের বিশ্বে যখন জলবায়ু সংকট, ঋণের বোঝা আর বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন এই ছয় অর্থনীতিবিদের চিন্তা নতুন করে প্রাসঙ্গিক। মানব উন্নয়ন সূচক, সক্ষমতা তত্ত্ব, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন – এসব ধারণা আজও নীতিনির্ধারকদের পথ দেখায়। তাঁরা দেখিয়েছেন, উন্নয়ন মানে শুধু জিডিপি বাড়ানো নয়, মানুষের জীবন বদলানো। আর সেই বদলের গল্প কিন্তু শুরু হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়া থেকেই।

