বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়, ফলে এর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের এলএনজি সরবরাহের বড় অংশই কাতারভিত্তিক সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে কাতারএনার্জির উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, কাতারএনার্জির পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে চুক্তিভিত্তিক আমদানিও ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
বর্তমানে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম অনেক বেশি। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ ডলার। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এপ্রিল মাসের কার্গোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে ১১ ডলারের মধ্যে, যা ব্রেন্ট ক্রুডের গড় মূল্য বিবেচনায় নির্ধারিত।
এই বড় দামের ব্যবধান সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হওয়ায় অতিরিক্ত প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকির প্রয়োজন হচ্ছে।
সংকট থাকা সত্ত্বেও এপ্রিল মাসে গ্যাস সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিদিন ২,৫৭০ থেকে ২,৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসবে প্রায় ১,৭০০ থেকে ১,৭৫০ এমএমসিএফডি। আর এলএনজি আমদানির মাধ্যমে যোগ হবে আরও ৮৭০ থেকে ৮৯২ এমএমসিএফডি গ্যাস।
সরবরাহকৃত গ্যাসের একটি বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে। দৈনিক প্রায় ৮২৫ থেকে ৮৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দেওয়া হলে সর্বোচ্চ ৪,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। অবশিষ্ট গ্যাস শিল্প, সার কারখানা ও গৃহস্থালি খাতে বিতরণ করা হবে। তবে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে।
এপ্রিলের সরবরাহ পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেও মে ও জুন মাসের জন্য এখনও নিশ্চিততা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের জ্বালানি সরবরাহ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং দেশীয় উৎপাদন জোরদার করা না গেলে এ ধরনের সংকট বারবার অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

