প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) একটি পদক্ষেপকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম বিতরণ করে সিইসি শপথ ভঙ্গ এবং সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তিনি সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও তফশিল তুলে ধরে ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’-এর আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ নিয়েছেন সংবিধান রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু কোন আইনের ভিত্তিতে তিনি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হওয়ার শপথ ফরম জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পাঠিয়েছেন—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, এই ধরনের কোনো এখতিয়ার সিইসির নেই এবং এ কাজের মাধ্যমে তিনি তার শপথ ভঙ্গ করেছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন যখন সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের জন্য ব্যালট দেয়, সেখানে কোথাও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হওয়ার কোনো বিধান বা আলাদা ব্যালট ছিল না। জনগণ সংসদ সদস্যদের যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তা একটি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে—কোনো ‘অস্তিত্বহীন পরিষদে’ অংশ নেওয়ার জন্য নয়।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটিকে “ভয়েড অ্যাব ইনিশিও”—অর্থাৎ শুরু থেকেই বাতিল—বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা আর নেই। সংবিধানের চতুর্থ তফশিলের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই ক্ষমতা বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে যে আদেশের আইনগত ভিত্তিই নেই, তার ওপর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করাও বৈধ নয়।
তার ভাষায়, এই আদেশটি কোনো অধ্যাদেশ বা আইন নয়, বরং সার্বভৌম সংসদের ক্ষমতাকে খর্ব করার একটি ব্যর্থ প্রয়াস এবং ‘প্রতারণার দলিল’।
এদিকে, একটি প্রচারণার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে যে বিএনপি সংস্কার চায় না বা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ মানে না—এটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত ওই সনদের প্রতিটি বিষয় তারা ধারণ করেন। তবে যেকোনো সংস্কারই হতে হবে সংবিধানসম্মত এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে।
তিনি আরও জানান, জাতীয় সনদের ৪৭টি বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছে, তা ভবিষ্যতে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ঘিরে এই বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা উসকে দিয়েছে। একদিকে সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে রূপ নিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে কী ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ সামনে আসে।

