চৈত্রের শেষ দিকে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু তেল ও গ্যাসের ঘাটতি এবং যান্ত্রিক সমস্যার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় শুরু হয়েছে লোডশেডিং। চলতি মাসের শুরু থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপ হয়ে এখন তা এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এতে দিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি পড়ছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্রে জানা যায়, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট হলেও গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় এর বড় অংশই পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
পিডিবি জানিয়েছে, লোডশেডিংমুক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনে অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে মাত্র ৯৩ কোটি ঘনফুট। পাশাপাশি ভারতের আদানির একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে।
গত রোববার রাত ৯টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট—ঘাটতি দাঁড়ায় ৭৩৭ মেগাওয়াটে। এর আগের দিন শনিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ১৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও লোডশেডিং ছিল প্রায় এক হাজার ৮০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে ঝুঁকিতে ফেলেছে। মার্চ মাসে সংকট তুলনামূলক কম থাকলেও এপ্রিল ও মে মাস নিয়ে বড় উদ্বেগ রয়েছে। এই সময়ে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট হলেও গ্যাস সংকটে এর বড় অংশই সারা বছর বন্ধ বা অর্ধচালু থাকে। এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিল–মে মাসে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কয়লা থেকে উৎপাদনও কমেছে। পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে এটি সীমিত রাখা হচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি খাতে এসব কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। তবে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় এসব কেন্দ্র পুরোপুরি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের কাছে সরকারের বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা জ্বালানি আমদানিতেও বাধা সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকার ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। দিনে প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে আলোকসজ্জা বন্ধ, অফিস সময় পরিবর্তন এবং বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদি সমাধান দিলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে লোডশেডিং সংকট আরও বাড়তে পারে।

