জাতীয় সংসদে এক দিনে সর্বোচ্চ ৩১টি বিল পাসের নজির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে নতুন রেকর্ড হিসেবে ধরা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১১তম কার্যদিবসে এসব বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, একই দিনে এত বিপুল সংখ্যক বিল পাস হওয়ার ঘটনা আগে দেখা যায়নি। গত পাঁচ কার্যদিবসে মোট ৬৮টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে রবিবার ২টি, সোমবার ৭টি, মঙ্গলবার ১৪টি, বুধবার ১৪টি এবং বৃহস্পতিবার একদিনেই ৩১টি বিল পাস হয়।
বেশিরভাগ বিল মাত্র ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে পাস হওয়ায় আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার গতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংবিধানের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকায় দ্রুততার সঙ্গে এসব বিল পাস করা হয়েছে।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চলতি অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করতে হবে। সেই সময়সীমার চাপের কারণেই দ্রুত বিল পাসের প্রয়োজন হয়েছে। তিনি জানান, বাকি অধ্যাদেশগুলোও বিল আকারে পাস করতে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদের অধিবেশন বসবে।
বৃহস্পতিবার পাস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬’, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল-২০২৬’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল-২০২৬’।
এসব বিলের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশও রহিত করা হয়েছে।
বিরোধী জোট এসব বিলের বিরোধিতা করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধনী বিল, বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলসহ স্থানীয় সরকারের পাঁচটি বিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পরে প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াত জোট সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। চলতি সংসদে এটি তাদের তৃতীয় ওয়াকআউট।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এসব ‘গণবিরোধী বিল’ পাসের দায় তারা নেবেন না। এ ঘটনার পর সংসদে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, আগের মানবাধিকার কমিশন কার্যত বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জিয়া পরিবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে। সরকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্নের অভিযোগ তুলেও বিরোধী দল আপত্তি জানায়। তবে সংসদে পাস হওয়া বিলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। ফলে আপাতত বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না এবং সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পথও বন্ধ হয়ে যায়।
বিরোধী পক্ষের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো যথাযথ আলোচনা ছাড়াই দ্রুত পাস করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন আইন পুনর্বহালকে তারা ‘পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্ত’ বলে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে সরকার পক্ষ জানায়, আইনি শূন্যতা এড়াতে এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কমিশনের কার্যক্রমে শূন্যতা তৈরি না হয় এবং আইনি অসঙ্গতি দূর করতেই এসব বিল আনা হয়েছে। সরকার মানবাধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও তিনি জানান।
বৃহস্পতিবার পাস হওয়া ৩১টি বিল (সংক্ষেপে তালিকা):
১. জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬
২. জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল-২০২৬
৩. বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল-২০২৬
৪. শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল-২০২৬
৫. বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল-২০২৬
৬. পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল-২০২৬
৭. বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল-২০২৬
৮. বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল-২০২৬
৯. স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) বিল-২০২৬
১০. আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল-২০২৬
১১. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল-২০২৬
১২. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল-২০২৬
১৩. জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধনী বিল-২০২৬
১৪. ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা বিল-২০২৬
১৫. বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) বিল-২০২৬
১৬. বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) বিল-২০২৬
১৭. মানবদেহে অঙ্গপ্রতঙ্গ সংযোজন বিল-২০২৬
১৮. বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবক) রেগুলেশন সংশোধন বিল-২০২৬
১৯. মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন বিল-২০২৬
২০. বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল-২০২৬
২১. বাংলাদেশ নভোথিয়েটার সংশোধন বিল-২০২৬ (নাম পরিবর্তন)
২২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট বিল-২০২৬ (নাম সংশোধন)
২৩. জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল-২০২৬
২৪. স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল-২০২৬
২৫. সিটি করপোরেশন (সংশোধন) বিল-২০২৬
২৬. বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬
২৭. রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬
২৮. উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল-২০২৬
২৯. ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা বিল-২০২৬
৩০. বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন সংশোধন বিল-২০২৬
৩১. নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (সংশোধন) বিল-২০২৬

