বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে বহুদিন ধরেই পরিবেশ সংরক্ষণের আলোচনা চলছে। দ্বীপটির ভঙ্গুর প্রকৃতি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটনের বাড়তি চাপ—সব মিলিয়ে নীতি নির্ধারকদের উদ্বেগ নতুন নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরিবেশ রক্ষার নামে নেওয়া একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যখন স্থানীয় মানুষের প্রধান আয়ের পথ প্রায় বন্ধ করে দেয়, তখন সেটি শুধু পরিবেশের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রূপ নেয় গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকটে। সেন্ট মার্টিনের বর্তমান পরিস্থিতি সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
দ্বীপবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটন সীমিত করার সিদ্ধান্তের পর সেন্ট মার্টিনের অর্থনীতি প্রায় থমকে গেছে। যেসব দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ছোট ব্যবসা, পরিবহনসেবা আর মৌসুমি বেচাকেনার ওপর পুরো দ্বীপের জীবনযাত্রা দাঁড়িয়ে ছিল, তার বড় অংশই এখন বন্ধ বা অচল। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এই সংখ্যা শুধু বেকারত্বের পরিসংখ্যান নয়; এর অর্থ হলো বহু পরিবারে নিয়মিত রান্না বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, শিশুদের পড়াশোনা থেমে যাওয়া, ঋণের চাপ বেড়ে যাওয়া, আর ভিটেমাটি ছেড়ে অজানার পথে যাত্রা।
গত ৩ এপ্রিল বিকেলে জেটিঘাটসংলগ্ন বাজার এলাকায় স্থানীয়দের উদ্যোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হওয়ার ঘটনাই বোঝায় যে ক্ষোভ এখন আর নিছক অসন্তোষে সীমাবদ্ধ নেই; তা জনজীবনের চাপা আর্তনাদ হয়ে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দ্বীপবাসীর দাবি, পর্যটন নিয়ন্ত্রণের এই নীতির ফলে সেন্ট মার্টিনে শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক জীবনও বিপর্যস্ত হয়েছে। সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যটনের প্রধান মৌসুম। অথচ টানা দুই বছর ধরে পর্যটক চলাচল সীমিত থাকায় যারা এই মৌসুমের আয়ের ওপর সারা বছরের খরচ চালাতেন, তারা এখন ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় আছেন।
সমস্যা আরও জটিল হয়েছে কারণ স্থানীয় অর্থনীতির বড় অংশই একমুখী। পর্যটন শুধু হোটেল ব্যবসায়ীদের আয় এনে দেয় না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নৌযানশ্রমিক, ডাব বিক্রেতা, খাবারের দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গাইড, ভ্যানচালক, দিনমজুর—অসংখ্য মানুষ। অর্থাৎ পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে কেবল একটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়, বরং দ্বীপের প্রায় পুরো বাজারব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়া। অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা গড়েছিলেন। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন কারও কারও সামনে রিসোর্ট বিক্রি করা বা দ্বীপ ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়িয়েছে। এই চিত্র প্রমাণ করে, সেন্ট মার্টিনে পর্যটন আর বিলাসী অর্থনীতি নয়; এটি বহু মানুষের ন্যূনতম বেঁচে থাকার ভিত্তি।
এখানেই শেষ নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৫ এপ্রিল থেকে মাছ ধরার ওপরও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ যে জেলেরা ভেবেছিলেন পর্যটন কমলেও অন্তত সাগর তাদের ভরসা হবে, তারাও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে। ফলে সেন্ট মার্টিনে জীবিকার দুটি প্রধান স্তম্ভ—পর্যটন ও মৎস্য আহরণ—একই সময়ে চাপের মুখে পড়ছে। এই অবস্থায় দ্বীপবাসীর অনেকেই মনে করছেন, তাদের জন্য কার্যত কোনো বিকল্প আয়ের পথ খোলা রাখা হয়নি। আর এ কারণেই এই সংকটকে অনেকে “অর্থনৈতিক” নয়, “মানবিক বিপর্যয়” বলছেন।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস এবং ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ৫৬। এই সংখ্যাগুলো থেকে বোঝা যায়, সেন্ট মার্টিন কোনো ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন জনবসতি নয়; এটি একটি সক্রিয় সামাজিক পরিসর, যেখানে পরিবার, শিক্ষা, বাজার, পেশা—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কিন্তু জীবিকার অভাবে সেখানকার অনেকে ইতিমধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও টেকনাফে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানচ্যুতি যখন শুরু হয়, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক ঘটনা থাকে না; তা সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক কাঠামো এবং স্থানীয় সংস্কৃতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
এই সংকটের সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রভাব পড়ছে শিক্ষাক্ষেত্রে। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করতে পারছে না। সেন্ট মার্টিন বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মদন কান্তি রুদ্র জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে ৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছে এবং সেখানে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীর উপস্থিতি বেশি। কিন্তু ছেলেদের অনেকে পরিবারের সঙ্গে জীবিকার খোঁজে কক্সবাজার বা টেকনাফে চলে গেছে। এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রথম ধাক্কা সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপরই পড়ে। এক প্রজন্মের স্কুলছুট হওয়া মানে পরবর্তী কয়েক বছর বা দশকে আরও বড় সামাজিক ব্যয় তৈরি হওয়া।
আইনজীবী এম কেফায়েত উল্লাহ খানের বক্তব্যও সেই আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করে। তার মতে, এক সময় দ্বীপের মানুষ মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সময়ের সঙ্গে তারা পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, দৈনন্দিন ব্যয়—সবকিছু এখন এই শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই নির্ভরতা যদি হঠাৎ ভেঙে যায়, তাহলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, পরিবার ভাঙন, অস্বাস্থ্যকর কাজের দিকে ঝুঁকে পড়া, এমনকি সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অর্থাৎ আজকের আয়হীনতা আগামী দিনের অপরাধ, বৈষম্য ও হতাশার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
আরও একটি অপ্রত্যাশিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো দ্বীপের বেওয়ারিশ কুকুরের খাদ্যসংকট। শুনতে বিষয়টি ছোট মনে হলেও এটি আসলে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্যের একটি অদ্ভুত কিন্তু বাস্তব সংযোগ তুলে ধরে। দ্বীপের কুকুরগুলো মূলত পর্যটক, বাসিন্দা এবং হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকত। পর্যটক না থাকায় খাবারের সেই উৎসও কমে গেছে। ফলে অনেক কুকুর না খেয়ে মারা যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন। টেকনাফ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্ধ্যত্বকরণ কর্মসূচির অভাব এবং খাদ্যসংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফয়েজুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপে দিন-রাত মিলে প্রায় আড়াই হাজার কুকুর বিচরণ করছে। এতে একদিকে মানুষের নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভারসাম্যের প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে প্রাণিকল্যাণের বিষয়টিও সামনে আসছে।
এই পুরো পরিস্থিতি একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন সামনে আনে: পরিবেশ রক্ষা কি মানুষের জীবন-জীবিকা উপেক্ষা করে করা সম্ভব? বাস্তবে উত্তরটি সহজ নয়। সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ সুরক্ষা জরুরি—এ নিয়ে দ্বিমত থাকার সুযোগ কম। প্রবাল, সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা, অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ—এসব নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্য হলো, সুরক্ষা ব্যবস্থার ভার একতরফাভাবে শুধু তাদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। যদি বছরে চার মাস আবহাওয়া অনুকূল থাকে এবং বাকি আট মাস পরিবেশ পুনরুদ্ধার, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো সংস্কার, পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও বহনক্ষমতা নির্ধারণের মতো কাজ করা যেত, তাহলে হয়তো ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান সম্ভব ছিল। এই যুক্তি খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ কোনো নীতি তখনই টেকসই হয়, যখন তা প্রকৃতি ও মানুষের প্রয়োজন—দুটিকেই একসঙ্গে বিবেচনায় আনে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ত্রাণনির্ভর জীবন চান না—এই বক্তব্যটিও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। হোটেল ব্যবসায়ী আবদুর রহমানের কথায়, তারা সাহায্যের প্যাকেট নয়, কাজের সুযোগ চান। এই চাওয়া শুধু অর্থনৈতিক নয়, মর্যাদারও প্রশ্ন। দ্বীপবাসী যদি নিজেদের শ্রম, ব্যবসা ও সৎ উপার্জনের মাধ্যমে জীবন চালাতে চান, তবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় তাদের অংশীদারিত্বের জায়গা থাকা উচিত। এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে সীমিত, নিয়ন্ত্রিত, পরিবেশসম্মত পর্যটন চালু থাকবে; একই সঙ্গে কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইকো-ফি, পর্যটকসংখ্যার সুনির্দিষ্ট সীমা, স্থানীয়দের বিকল্প প্রশিক্ষণ এবং জীবিকার বহুমুখীকরণের উদ্যোগ থাকবে।
বর্তমান সংকটের গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি কেবল পর্যটন বন্ধ হওয়ার গল্প নয়। এটি মূলত পরিকল্পনাহীন রূপান্তরের গল্প। যখন একটি এলাকার অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি খাতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই খাতে হঠাৎ বিধিনিষেধ পুরো সমাজকে নড়িয়ে দেয়। সেন্ট মার্টিনে এখন সেটাই হয়েছে। পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্ত যদি আগাম পুনর্বাসন, বিকল্প আয়, ক্ষুদ্রঋণ পুনর্গঠন, শিক্ষা-সহায়তা, জেলেদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা এবং পশু ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত মানুষের কাছে সংরক্ষণ নয়, শাস্তি হিসেবেই প্রতীয়মান হবে।
এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়দের অন্তত চলতি মাসের জন্য ভ্রমণবিধিনিষেধ আংশিক শিথিল করার দাবি এসেছে। তাদের বক্তব্য, পর্যটন মৌসুম শুরু হতে এখনও দেরি থাকলেও অন্তত এক মাসের জন্য জাহাজ চলাচলের অনুমতি মিললে কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য হবে, আর সেই আয় দিয়ে তারা বাকি সময়টুকু কোনোমতে টিকে থাকতে পারবেন। এই দাবির পক্ষে-বিপক্ষে নীতিগত বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এটুকু স্পষ্ট—মানুষ যখন এমন অনুরোধ জানায়, তখন তাদের অবস্থান আরাম নয়, টিকে থাকার জায়গা থেকে।
সেন্ট মার্টিন আজ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রাখছে। প্রকৃতি ও মানুষকে আলাদা করে দেখার সময় শেষ। প্রবাল রক্ষার পরিকল্পনা যদি মানুষের জীবন ধ্বংস করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিকভাবে টিকবে না। আবার অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন যদি দ্বীপের পরিবেশ ধ্বংস করে, তবে সেখানেও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই ক্ষতি হবে। তাই দরকার বিরোধ নয়, ভারসাম্য। সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে হলে শুধু দ্বীপের মাটি, পানি আর প্রবাল নয়—সেখানকার মানুষের জীবন, শিক্ষা, সম্মান আর ভবিষ্যৎকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই প্রকৃত অর্থে সুরক্ষা সম্ভব হবে।

